নিজস্ব প্রতিবেদক
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে উন্নয়ন শুধু ঢাকা শহরকেন্দ্রিক ছিল বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে, এই দাবির বিপরীতে শেখ হাসিনার সরকারের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহীত “একটি বাড়ি একটি খামার”, “আশ্রয়ণ” এবং “কমিউনিটি ক্লিনিক” প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে কীভাবে ঢাকার বাইরে উন্নয়নের ধারা প্রসারিত হয়েছে, তা তুলে ধরা হয়নি। এই প্রকল্পগুলো গ্রামীণ জনজীবনের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও একই ধরণের মন্তব্য করে বলেন, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে উন্নয়নের ফিরিস্তি ‘বিভ্রান্তিকর’।
এসডিজি বাস্তবায়নের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতে কর্মসূচি বাস্তবায়নেও অনেক ফাঁকফোকর ছিল বর্তমানে তাদের বাড়তি সুবিধা দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এ অর্থনীতিবিদ।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম জানিয়েছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি বাস্তবায়নের প্রধান লক্ষ্য হলো কাউকে পেছনে ফেলে উন্নয়ন নয়। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মূল ধারায় নিয়ে আসা। এজন্য এসব জনগোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দিতে হবে।
সেমিনারে পৃথক দুই সেশনে নারী-শিশু নির্যাতন ও শিশুশ্রমের বিষয় উঠে আসে। তাদের আইনি সুরক্ষা বাড়াতে জোর দেয়া হয়। এসময় নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় বিগত সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিভাজিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। চেপে ধরা হয়েছে বেসরকারি সংগঠনগুলোর টুঁটি। কথা বলতে দেয়া হয়নি।
আসল চিত্রটা ভিন্ন।
“একটি বাড়ি একটি খামার”: গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষমতায়ন
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চালু হওয়া “একটি বাড়ি একটি খামার” প্রকল্পটি গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে কাজ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২১ লাখ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। ফলস্বরূপ, গ্রামাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এটি শুধু ঢাকার বাইরে উন্নয়নের প্রমাণই নয়, বরং গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
“আশ্রয়ণ” প্রকল্প: ভূমিহীনদের জন্য আশ্রয় ও মর্যাদা
“আশ্রয়ণ” প্রকল্পের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোর জন্য ঢাকার বাইরে বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে বিনামূল্যে ঘর ও জমি প্রদান করেছে। ১৯৯৭ সালে প্রথম শুরু হওয়া এই প্রকল্প ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ পরিবারকে সুবিধার আওতায় এনেছে। পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার, সিলেট থেকে বরিশাল—এই প্রকল্প গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, শেখ হাসিনার উন্নয়ন দৃষ্টি শুধু মেগা প্রকল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
“কমিউনিটি ক্লিনিক”: গ্রামে স্বাস্থ্যসেবার বিপ্লব
শেখ হাসিনার আরেকটি যুগান্তকারী উদ্যোগ “কমিউনিটি ক্লিনিক” প্রকল্প গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪,০০০ কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যকর রয়েছে, যেগুলো প্রতিদিন লাখো মানুষকে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা, ওষুধ এবং মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। এই ক্লিনিকগুলো গ্রামীণ নারী, শিশু এবং প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে, যা শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে।
মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়ন
পদ্মা সেতু, রূপপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট, দক্ষিনাঞ্চলে বিদ্যুতকেন্দ্রে থেকে শুরু করে হাজারো প্রকল্প, মাতারবাড়ী মতো মেগা প্রকল্পগুলো কোনটাই শহরকেন্দ্রিক না। এই প্রকল্পগুলোর সুফলও গ্রামীণ অঞ্চলে পৌঁছেছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিকে জাগিয়ে তুলেছে, যেখানে কৃষিপণ্য পরিবহন এবং বাজার সংযোগ সহজতর হয়েছে। রূপপুর প্রকল্প পাবনার স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। শতেক ইকোনমিকাল জোন স্থানীয় অর্থনীতিতে উন্নত করার জন্যই করা হয়েছে, যার সবগুলোই শরের বাইরে।
শেখ হাসিনার সরকারের আমলে উন্নয়ন শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। “একটি বাড়ি একটি খামার” গ্রামীণ দারিদ্র্য দূর করেছে, “আশ্রয়ণ” ভূমিহীনদের জন্য আশার আলো হয়েছে এবং “কমিউনিটি ক্লিনিক” স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কমিয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনার প্রচেষ্টা এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে স্পষ্ট।
শেখ হাসিনার আমলের উন্নয়নকে শুধু মেগা প্রকল্পের চশমায় দেখলে পুরো চিত্রটি অস্পষ্ট থেকে যায়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য তাঁর সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, উন্নয়নের সুফল ঢাকার বাইরেও পৌঁছেছে। সমালোচনার মাঝেও এই প্রকল্পগুলোর প্রকৃত অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। সঠিক তথ্য ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই উন্নয়নের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
Visited 252 times, 1 visit(s) today