❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালকে পূর্ণাঙ্গভাবে সচল করার লক্ষ্যে অতিরিক্ত ৯০২ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়ে জাতীয় সংসদে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের দায়ভার চাপালেন মন্ত্রী আওয়ামী লীগ সরকারের ঘাড়ে। তার দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার কেবল ভৌত অবকাঠামো ও ভবন উন্মোচন করে প্রকল্প সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। কিন্তু বিএনপি সরকারকে এখন সব কাজ সম্পন্ন করতে হচ্ছে।
যদিও বাস্তব পরিস্থিতি তার বক্তব্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য।
মন্ত্রী জানান, প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই বিশাল জাতীয় সম্পদ সচল করতে অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা মেটানো এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থার বকেয়া পরিশোধের জন্য এই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।
৩০শে আগস্ট, রোববার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ অধিবেশনে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদের একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বিমানমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ তার প্রশ্নে উল্লেখ করেন যে, এই আন্তর্জাতিক টার্মিনালটির প্রাথমিক বাজেট ১৩ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ধাপে ধাপে তা বেড়ে ২১,৩০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
তদুপরি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পটিতে প্রায় ৪,৪৬৯ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম খুঁজে বের করেছে এবং ঠিকাদারদের নিকট থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুপারিশ দিয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে মূল কাজের ৯৯.৯১ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পরও একেবারে শেষ সময়ে এসে পুনর্দফায় ৯০২ কোটি টাকা বাড়ানো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির বাড়তি সুযোগ দেওয়ার শামিল কি না—তা মন্ত্রীর কাছে জানতে চান তিনি।
উত্তরে বিমানমন্ত্রী দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেবল ভৌত অবকাঠামো ও ভবন উন্মোচন করেই প্রকল্প সমাপ্তি ঘোষণার একটি অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। তবে বাস্তবে থার্ড টার্মিনালের প্রয়োজনীয় মেশিনারিজ, বিভিন্ন জটিল সংকেত ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সংযোজনমূলক গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই ফেলে রাখা হয়েছিল।
তার ভাষ্য, অসমাপ্ত থাকায় প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই জাতীয় সম্পদ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল। ফলে একদিকে যেমন এটি থেকে সরকার কোনো সেবা পাচ্ছিল না, অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার কাছ থেকে গৃহীত ঋণের বড় অঙ্কের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে গেলেও মূল স্থাপনা থেকে কোনো ধরনের আয় আসছিল না।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সব আর্থিক হিসাবপত্র পুনর্নিরীক্ষা করে দেখেছে যে কাজটি চূড়ান্তভাবে শেষ করা, ঠিকাদারের বিগত দিনের বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া এবং অন্যান্য সংস্থার বকেয়া পরিশোধপূর্বক পুরো অবকাঠামো চালু করার জন্য ৯০২ কোটি টাকার প্রয়োজন।
সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখেই এই অর্থের চাহিদা প্রস্তুত করা হয়েছে দাবি করে মন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত এই অর্থ অনুমোদন না পেলে দৃষ্টিনন্দন ও সুবিশাল এই টার্মিনালটি পুরোপুরি অকেজো ও অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকত, যা দেশ ও জাতির জন্য এক চরম ক্ষতির কারণ হতো।
বিমানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, অতিরিক্ত এই ৯০২ কোটি টাকার অনুমোদন মিললে খুব দ্রুতই তৃতীয় টার্মিনালটি যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে। এর ফলে বিদ্যমান ১.২ মিলিয়ন যাত্রীর পরিবর্তে দ্বিগুণ সংখ্যক যাত্রীকে আধুনিক সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে এবং সেই বর্ধিত আয় থেকেই জাইকার ঋণ সহজেই শোধ করা যাবে। এই যৌক্তিক কারণেই পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বরাদ্দের চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান ভাড়া ১২ হাজার টাকা নয়: বিমানমন্ত্রী
অধিবেশনে বিমান ভাড়ার চরম বৃদ্ধি এবং টিকিট কালোবাজারি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অপর একটি সম্পূরক প্রশ্ন তোলেন এমপি মুজিবুর রহমান।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, দেশীয় আকাশপথে বিমানের ভাড়া আচমকা ৬,০০০ টাকা থেকে দ্বিগুণ বেড়ে ১২,০০০ টাকায় গিয়ে পৌঁছায়, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও অস্বাভাবিক।
জবাবে বিমানমন্ত্রী বিষয়টিতে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, সাধারণ কোনো একমুখী (ওয়ান-ওয়ে) টিকিটের মূল দর কখনোই ১২,০০০ টাকা ছুঁয়ে যায়নি। সাধারণত যাতায়াতের উভয়মুখী (রিটার্ন) টিকিট অথবা বিশেষ সরকারি কর যোগ করা হলে ভাড়ার অঙ্কটি সাময়িকভাবে বড় দেখায়।
তিনি ব্যাখ্যামূলকভাবে বলেন, বিমানের মূল বেসিক টিকিটের দাম নির্দিষ্ট সীমার ভেতরেই বজায় রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয় সরকারের প্রায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ট্যাক্স। সব মিলিয়ে একটি সাধারণ টিকিটের যৌক্তিক দাম দাঁড়ায় প্রায় ৬,৩০০ থেকে ৬,৪০০ টাকার কাছাকাছি।
তবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে শেষ মুহূর্তে চড়া দামে টিকিট বিক্রির অপচেষ্টায় একশ্রেণির অসাধু চোরকারবারি চক্র সক্রিয় থাকে বলে স্বীকার করেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে কালোবাজারি পুরোপুরি নির্মূল করতে সরকার দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও তিনি সংসদকে অবহিত করেন।
ভবিষ্যতে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কোনো যাত্রী যেন বাড়তি মূল্যে টিকিট কিনতে বাধ্য না হন এবং যাত্রীরা যেন মূল ৬,৪০০ টাকার আশপাশেই টিকিট পান, তা সরকার নিশ্চিত করবে বলে বিমানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেন।
