চবি প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্নাতকে ভালো ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের অনেককেই পরীক্ষা দিতে দিচ্ছে না শিবিরের গুপ্ত কর্মীরা। বিভিন্ন বিভাগে স্নাতকোত্তর পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে মব সৃষ্টির মধ্যদিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সাধারণ শিক্ষার্থীর নামে শিবিরের নেতাকর্মীরা এ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এছাড়া শিবিরের পদধারী ও গুপ্ত কর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকেই বিভিন্ন বিভাগের শীর্ষ শিক্ষার্থীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়া থেকে বিরত রাখাছে।
গত বছরের ৫ই আগস্টের পর টানা ৭ মাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে না দেয়ার বিষয়ে অনুসন্ধান চালায় টিম বিডি ডাইজেস্ট। এমনকি বিডি ডাইজেস্টের চবি প্রতিনিধি শিবির-সমর্থক হিসেবে তাদের গুপ্ত কর্মীদের সঙ্গে মিশে অনুসন্ধান পরিচালনা করে। এ সময় চবির ৫৪টি বিভাগের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় গোপন রেখে তাদের সমস্যা সম্পর্কে অনুসান্ধান পরিচালনা করা হয়।
বিডি ডাইজেস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে যেসব শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যায়ে মেধা তালিকায় ১ম থেকে ৫ম এবং স্নাতক পর্যায়ে যাদের সিজিপিএ ৩.৫-এর বেশি, তাদের অনেককেই পরীক্ষা দিতে দেয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী প্রগতিশীল এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু, তারাই শিবিরের প্রধান টার্গেটে। এছাড়া, ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের তো ক্যাম্পাসেই প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
গত ৩০শে নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্বের ভাইভা পরীক্ষা দিতে যান ২০১৯-২০ সেশনের সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান৷ পরীক্ষার আগে তাকে হল থেকে বাইরে নিয়ে শারীরিকভাবে চরম নির্যাতন চালায় শিবিরের সদস্যরা। পরে মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে তাকে হাটহাজারী মহাসড়কের পাশে ফেলে রেখে যায় শিবির কর্মীরা।
সেদিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভাইভা পরীক্ষা শুরু হওয়ার প্রায় আধঘন্টা আগে জুনিয়র পরিচয় দিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাকে বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর তারা পরীক্ষা কেন্দ্রের পেছনে জঙ্গলে নিয়ে ৫-৬ জন মিলে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। এর মধ্যে একজন বলতে থাকে তোদের মত নাস্তিকরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হলে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। হাসিনার রেখে যাওয়া কোন লিগ্যাসি এই ক্যাম্পাসে রাখা হবে না।
চলতি বছরের ৬ই জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) মাস্টার্সের পরীক্ষা দিতে এসে শিবিরের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়েন সাজ্জাদ হোসেন। তিনি অফিস কক্ষে বসে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র সাজ্জাদ। পরে প্রক্টরিয়াল বডির মাধ্যমে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে শিবিরের নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের পরীক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. ভূঁইয়া মো. মনোয়ার কবীর গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে কোনো নির্দেশনা না থাকায় আমরা তার পরীক্ষার সুযোগ করে দেই। আমরা তাকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিতে দিয়েছি। যে কেউ যেকোনো আদর্শ ধারণ করতে পারে। তার বিরুদ্ধে লিখিত নির্দেশনা দিলে তাকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিতাম না।
শিক্ষার্থী ও ভুক্তভোগীরা জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের অন্তত মোট ৩০ থেকে ৩৫টি ইউনিট রয়েছে। এসব ইউনিটে সমর্থক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। বিভিন্ন বিভাগে স্নতকোত্তর পরীক্ষা চলাকালে শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা ক্যাম্পাসে রেকি করে শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতায় এগিয়ে থাকাদের শনাক্ত করে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে মব তৈরি করে তারপর তাদের পরীক্ষার হল থেকে বিতাড়িত করে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক পর্যায়ের প্রথম হয়েছিলেন অনিরুদ্ধ বিশ্বাস। এবার তাকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়া হয়নি। এছাড়া, একই বিভাগের মেধা তালিকায় চতুর্থ আকিব জাভেদকেও পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়নি। অনিরুদ্ধ ও আকিবকে ক্যাম্পাসে হুমকি দেয় শিবিরের সাথী পর্যায়ের এক নেতা। ক্যাম্পাসে দেখলেই মেরে ফেলবে বলা হয়েছে তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী তানভীর আলম তুষারকে পরীক্ষার মব সৃষ্টির মাধ্যমে পরীক্ষার হল থেকে বের করে আনে শিবিরের কর্মী-সমার্থকরা। এরপর একটি রুমে নিয়ে তার ওপর চরম শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং পরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। তুষার বিভাগটিতে শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে প্রথম সারির দিকে রয়েছেন।
ইতিহাস বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের সৌরভ ভুঁইয়াও শিক্ষক হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। তাকেও পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়নি শিবিরের নেতাকর্মীরা।
এছাড়া, বাংলাদেশ স্টাডিজের ১৮-১৯ ব্যাচের আবু তাইফ পাঠান, দর্শন বিভাগের ১৮-১৯ সেশনের ওমর শরীফ হৃদয়, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ১৭-১৮ সেশনের আফ্রিদি নিটুকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়নি শিবিরের নেতাকর্মীরা।
আর আওয়ামী লীগের দোসর ট্যাগ দিয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের ১৮-১৯ সেশনের মামুন মিয়া, লোকপ্রশাসন বিভাগের ১৮-১৯ সেশনের আরশিল আজিম, ফিশারিজ বিভাগের ১৯-২০ সেশনের সুমন কুমার কীর্তনিয়া, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৯-২০ সেশনের সজীব মোড়ল, আইএমএল বিভাগের ১৯-২০ সেশনের দেবব্রত এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের ১৮-১৯ সেশনের আব্দুল্লাহ জোবায়ের নিলয়কেও পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়নি শিবির।
