জয় আদিত্য
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর একের পর এক সংঘবব্ধ সহিংস কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে। দেশে উগ্রবাদী জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি প্রথাগত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরও সরাসরি এই কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। সরকারের পক্ষ থেকে মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা বলা হলেও দৃশ্যমান কোন কার্যক্রম নেই। একই সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরব ভূমিকা পালন সরকারের অবস্থান নিয়েও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী ও দায়িত্বশীল উপদেষ্টারা মব ভায়োলেন্সের পক্ষে অব্স্থান নিয়েছেন। তারা বিভিন্ন বক্তব্য, মতামত ও উষ্কানির মাধ্যমে এই কার্যক্রমকে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। অন্যদিকে একটি দায়সারা বিবৃতি দিয়ে মব ভায়োলেন্সের ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন। তাদের এই দ্বিমুখী অবস্থানটা কৌশলগত।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ‘মব ভায়োলেন্স’-এর ঘটনা ঘটে। এটি আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া সাধারণত একদল ব্যক্তির পরিচালিত বেআইনিভাবে কাউকে শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়া। এ পদ্ধতিতে প্রায়শ কোনো ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারা বা গুরুতর আহত করা হয়। তবে এসব ঘটনায় ‘মব লিঞ্চিং’ বলেও একটি শব্দ ব্যবহৃত হয়।
ব্রিটানিকার সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘লিঞ্চিং’ সহিংসতার একটি রূপ যেখানে জনতা বিনা-বিচারে, প্রায়শই নির্যাতন এবং শারীরিক অঙ্গহানি ঘটিয়ে কোনো ‘অভিযুক্তকে’ মৃত্যুদণ্ড দেয়। তারা বলছে, ‘লিঞ্চ’ শব্দটি একটি স্বগঠিত আদালতকে বোঝায়, যা আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই একজন ব্যক্তির ওপর শাস্তি আরোপ করে। আর এ শব্দটি চার্লস লিঞ্চের নাম থেকে উদ্ভূত হয়েছে। যিনি ভার্জিনিয়ার একজন চাষি। ‘ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠায় যিনি একটি অনিয়মিত আদালত গঠন করেন।
গত ৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূখ্য চরিত্র ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুরু হয়। দেশীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী, বিতর্কিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এতে সরাসরি অংশ নেন। নারায়ে তাকবির দিয়ে শুরু হওয়া এই ধ্বংসাত্নক কার্যক্রমে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নীরব ভূমিকা পালন করেন। সেনা বাহিনীর সদস্যরা এসেও সেই ধ্বংসাত্নক কার্যক্রম দাঁড়িয়ে থেকে দেখেন। তারাও প্রতিরোধে যাননি।
সেদিন থেকে শুরু হওয়া ধ্বংসাত্নক কার্যক্রমের লাগাম এখনো টানতে পারেনি সরকার। অরক্ষিতভাবে পড়ে থাকা ওই বাড়ি থেকে এখনো লুটপাট কার্যক্রম চলছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সরাসরি সমর্থনে এই ঘটনা ঘটেছে এবং এই কার্যক্রম পরিচালনায় তারা প্রত্যাক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাছাড়া, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে লোকজনের উপস্থিতি ধরে রাখতে গরু জবাই ও তা রান্না করে যে খাবার বিতরণ করা হয়, সেটিও সরকারের এক উপদেষ্টার নির্দেশে ও আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে।
গত ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকার সাভার উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এলাকাবাসী। ওইদিন সন্ধ্যায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজীব ও যুগ্ম সম্পাদক ফখরুল আলম সমরের পৈতৃক বাড়ি ‘রাজ মঞ্জিল’ ভাঙচুর করতে আসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী-সমর্থক ও উগ্রবাদী গোষ্ঠী। তারা হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দেন, ‘দেশ থেকে সব স্বৈরাচারকে বের করে দেওয়া হবে’, ‘স্বৈরাচারের আস্তানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে’, ‘শহীদদের অবদান বৃথা হতে দেওয়া হবে না’।
এরপর তারা রাজ মঞ্জিলের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে জানলার কাচ ভাঙচুর করেন। ভবনের বাইরের একটি অংশে আগুন দিতে গেলে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা তাদের বাধা দেন। উগ্রবাদীরা বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়লে শতাধিক এলাকাবাসী তাদের ধাওয়া দেন এবং কয়েকজনকে ধরে গণপিটুনি দেন। এ ঘটনায়ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে হামলা করতে আসা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলকারীদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
গত ৭ই ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে লুটপাট করতে গিয়ে স্থানীয়দের জনরোষের শিকার হন বৈষম্যরিবোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মী-সমর্থকরা। তারা প্রথমে হামলা চালিয়ে মালামাল লুটপাট শুরু করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ ঘটনায়ও লুটপাটকারীদের পক্ষে অবস্থান নেয় সরকার। লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে উল্টো স্থানীয়দের হয়রানি শুরু করে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গণ-গ্রেপ্তারের আওতায় নিয়ে আসতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামক বিতর্কিত কার্যক্রম শুরু করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যম কর্মী মাসুদ কামাল সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে বলেন, ৩২ নম্বরের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমার কাছে মনে হচ্ছে, দেশে আদৌ কোন সরকার আছে কিনা। কিন্তু নতুন সরকার গঠনের ৬ মাস পরে এসে এসব ঘটনায় সরকার কিছুই বললো না। এসব ঘটনায় কিছু না বলার মাধ্যমে সরকার বলতে চায় তোমাদের যার যা ইচ্ছা করো, কিছু বলবো না। ৩২ নম্বরের ঘটনায় সরকার চুপ করে থাকলো। তার মানে এই কাজটা সরকারই করেছে? আমি বলবো সরকার এর সঙ্গে আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বৈশ্বিক গণমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন এগুলো করা যাবে না, বন্ধ করতে হবে। কিন্তু উনি চেয়ে চেয়ে দেখলেন। একটা কিছু.. মানে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, এই একটা জিনিস হলেই সব জায়েজ। জিনিসটা শুধু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যাচ্ছে না, এটা জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যাচ্ছে। এটার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদা রওনক খান বিবিসিকে বলেন, সরকার এই মব কালচার বা ধ্বংসযজ্ঞটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। হতে পারে এতে তাদের মৌন সম্মতি আছে। যা একটি দেশের জন্য দিনশেষে ক্ষতিকর।
