বিশেষ প্রতিবেদন
“দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর” আখ্যা দিয়ে সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ ও সাংবাদিকসহ ৭৪৯ জনের একটি হিটলিস্ট তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছে AFIA নামের একটি সংস্থা। তালিকাভুক্তদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশ এবং ICC-তে বিচার ও পাসপোর্ট বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে।
গত বছরের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তোলার মত করে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী তো বটেই, শেখ হাসিনা সরকারের সময় সুবিধাপ্রাপ্ত, দলীয় নেতৃবৃন্দের ঘনিষ্ঠ, পরিবারে আওয়ামী রাজনীতি করে কেউ, এমন ব্যক্তিদের আওয়ামীপন্থি হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে; তাদের ওপর নেমে এসেছে খড়গ। হত্যা তো করা হয়েছেই, সরকারি-বেসরকারি চাকরিরতদেরও জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে।
যাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যায়নি বিধিমালার কারণে, তাদের জোরপূর্বক পদত্যাগ বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। যারা টিকে গেছেন, তাদের নাম হিটলিস্টে উঠেছে। সামরিক বাহিনী এবং বেসামরিক প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ, সাংবাদিকসহ যারা শেখ হাসিনা সরকারের সময় সুনামের সাথে কাজ করেছেন, দেশের উন্নয়নে স্ব স্ব ক্ষেত্র থেকে অবদান রেখেছেন, এমন ব্যক্তিদের নাম উঠেছে সেই তালিকায়। সত্য-মিথ্যা নিরুপণ ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে।
৭৪৯ জনের এই হিটলিস্ট এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেখানে সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন ১৬০ জন, নৌবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা- ৬০ জন, বিমান বাহিনীর ৪২ জন, বেসামরিক প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ১০২ জন, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৯৬ জন এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিক রয়েছেন ১৮৯ জন।
আওয়ামীপন্থিদের হিটলিস্ট- ৭৪৯ জনের নামের তালিকা
৪৯ পৃষ্ঠাব্যাপী বিস্তৃত পিডিএফ ফরমেটের তালিকাটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চিহ্নিত ব্যক্তিদের পরিচিতি, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে এটা স্পষ্ট, তালিকা তৈরিতে কাজ করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিশেষ ব্যক্তিবর্গ। বিশেষত, সামরিক বাহিনীর (সেনা, নৌ, বিমান) যাদের পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে থাকার কথা নয়। একই কথা বেসামরিক প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মতাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের পরিচিতির মত স্পর্শকাতর তথ্য রাষ্ট্রের কোনো ক্ষমতাশালী গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমেই তৈরি হয়ে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সামরিক বাহিনীতে কর্মরত কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা সামরিক আদালতেই নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু কোন উদ্দেশ্যে তাদের আওয়ামীপন্থি সাব্যস্ত করে অপরাধের তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে এভাবে অপদস্থ করা হচ্ছে, এর পেছনে খারাপ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। প্রযোজ্য, পুলিশ ও সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও। আইনি প্রবিধান ছাড়াই মব তৈরির মাধ্যমে তাদের হেনস্থার উদ্দেশ্য রয়েছে বলে অনুমান করছেন নেটিজেনরা।
এভাবে তালিকা করে, অপরাধের তদন্ত বা বিচার ছাড়া কারো পাসপোর্ট বাতিল কিংবা জাতিসংঘের দৃষ্টিগোচরের জন্য হিটলিস্ট তৈরিকে দূরভিসন্ধি আখ্যা দিয়েছেন অনেকেই। এমন হিটলিস্টের কারণে যদি কারো জীবন বিপন্ন হয়, প্রতিহিংসার শিকার হন কেউ, তবে এর দায় কে নেবে? এমন প্রশ্ন উঠেছে।
