নিজস্ব প্রতিবেদক
ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির সাথে বিরোধ এবং শালিসে মারধরের পর রাতভর নিখোঁজ থাকার পর গলায় ফাঁস দেওয়া এক হিন্দু যুবকের মরদেহ মিলল বাড়ি থেকে দূরে এক নিম গাছের ডালে।
শুক্রবার দিবাগত রাতে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ইউনিয়নের লাঙ্গলদাাড়িয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহতের নাম অনিমেষ সরকার (৩৫), তিনি গ্রামের নিরঞ্জন সরকারের পুত্র।
শনিবার সকাল ১১টার দিকে পুলিশ এসে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় নিহতের মা শেফালী রানী সরকার কারো নাম উল্লেখ না করে শনিবার রাতে থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-১৮) দায়ের করেছেন।
এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজনকে আটক করেছে।
পরিবারের সদস্যলা জানান, ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির সাথে বিরোধের পর শালিস ও মারধরের পর রাতে বাড়ি ফেরেননি অনিমেষ। অনেক খোঁজাখুজির পরও তার সন্ধান মেলেনি। এরপর সকালে তার লাশ পাওয়া যায় নিম গাছের ডালে ফাঁস দেওয়া অবস্থায়।
হত্যার পর লাশ গাছের ডালের সাথে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে দাবি অনিমেষের পরিবারের।
পেশায় সাইকেল মেকানিক অনিমেষ চার বছরের একটি পুত্র ও ৯ মাসের একটি কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন।
জানা যায়, অনিমেষের বাবা নিরঞ্জন সরকার প্যারালাইসিসে শয্যাশায়ী। বাজারে অনিমেষের সাইকেল ও রিকশাভ্যান মেরামতের দোকান রয়েছে। এছাড়া বাড়ির ২শ গজ দূরে শ্রীউলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল মালেক মল্লিকের বাড়ির পেছনে দুই বিঘার একটি মাছের ঘের রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, অনিমেষ প্রতিদিন রাতে দোকান বন্ধ করে ঘের থেকে ঘুরে তারপর বাড়িতে আসতো। ঘটনার আগের রাতে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
অনিমেষের মা শেফালী রানী সরকার ও স্ত্রী সঞ্জিতা সরকারের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি সভাপতি আব্দুল মালেক মল্লিক ও তার ভাই অহিদ মল্লিক গং আগস্টের ৫ তারিখের পর থেকে অনিমেষকে নানাভাবে মানসিক নির্যাতন, মারধর ও হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন। কথায় কথায় তাদের ভারতে চলে যাবার জন্য চাপ দিতেন।
স্বজনদের দাবি, প্যারালাইজড বাবা ও নিরীহ অনিমেষসহ পুরো পরিবারকে গ্রামছাড়া করার জন্যই তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছেন বিএনপি নেতা মল্লিক গং। অনিমেষদের জমিজমা-ভিটেমাটি দখল করার জন্যই তাদের ওপর এভাবে নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।

নিহত অনিমেষ সরকার
শেফালী রানী বলেন, আমাদের পুকুরের পানি সেচ করে শ্যালো মেশিন দিয়ে বাড়ির পিছনের ছোট পুকুরে ফেলা হচ্ছিল। পুকুরের পাশেই অহিদ ও মালেকদের মাছের ঘের। আমাদের পুকুরের পানি তাদের ঘেরে পড়ায় তাদের মাছ নাকি আমাদের পুকুরে চলে আসছে, এমন দাবি করে গত বুধবার তারা গালাগাল করে। প্রতিবাদ জানালে অনিমেষকে মারধর করে পুকুরে ফেলে দেয়। মারধরের ছবি-ভিডিও নেওয়ার কারণে তার মোবাইল ফোনও পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর অনিমেষ স্থানীয় মাতব্বরদের কাছে অভিযোগ করেন। শালিস-দরবার করতে বকচর গ্রামের বিএনপির কর্মী আলমগীর হোসেন, মাড়িয়ালা গ্রামের আফছার আলী সরদারসহ কয়েকজন আসেন। কিন্তু তারা প্রভাবশালী বিএনপি নেতা আব্দুল মালেকের পক্ষে ফয়সালা কথা বলেন বলে জানান শেফালী রানী।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবার সকাল ১০টায় অনিমেষের বাড়িতে শালিস-বৈঠক বসে। আব্দুল মালেক বিএনপির সভাপতি হওয়ায় কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করেনি। শালিসে উপস্থিত বিএনপির কর্মীরা উল্টো অনিমেষকে দায়ী করে মালেকের হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে বলে। অনিমেষ বাধ্য হয়ে ক্ষমা চাইতে গেলে তাকে লাথি মেরে পুকুরে ফেলে দেয় মালেক ও অহিদ। মালেক ও অহিদ এবং তাদের পরিবারের ছেলেরা অনিমেষকে প্রকাশ্যে খুন করার হুমকিও দেয়। এতে অনিমেষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন।
অনিমেষের স্ত্রী সঞ্জিতা বলেন, হুমকি-ধমকিতে অনিমেষ খাওয়া-দাওয়াও করতে পারেনি। বিকেল পর্যন্ত সে বাড়িতেই ছিল। অহিদ-মালেকদের ভয়ে সে ঢাকায় চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। সন্ধ্যার একটু আগে দোকানে যায়। রাত ৯টা পর্যন্ত সেখানেই ছিল। কিন্তু গভীর রাত পর্যন্ত বাড়িতে না ফেরায় মোবাইলে কল দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। অনেক খোঁজ-খবর করেও তার সন্ধান পাইনি।
তিনি জানান, সকালে খালেক মোল্লার ছেলে বাবুল মোল্লার নিম গাছে নাইলনের দড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অনিমেষের লাশ দেখেন একই গ্রামের ইমদাদুল হকের স্ত্রী নারগিস খাাতুন। খবর পেয়ে স্বজনরা অনিমেষের লাশ দেখতে পান। এরইমধ্যে অনিমেষ আত্মহত্যার করেছে বলে গ্রামজুড়ে প্রচার চালিয়ে যান বিএনপির সভাপতি আব্দুল মালেক মল্লিক ও তার ভাই অহিদ মল্লিকরা।
লাশের পা কাদামাখা এবং গায়েও কাদামাটি ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। তাদের ভাষ্যমতে, কেউ সজ্ঞানে আত্মহত্যা করলে তার সারা শরীরে কাদামাটি মাখা থাকবে কেন?
এ সময় অহিদ মল্লিক দাবি করেন, তিনি অনিমেষের মৃত্যু সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
অহিদ মল্লিকের স্ত্রী লাভলীর দাবি, পুকুরে তাদের অংশ থাকলেও তারা ব্যবহার করেন না। অনিমেষ তাদের না জানিয়ে পুকুরের পানি মাছে ঘেরে ফেলছিল। এ নিয়ে মহিলারা গালিগালাজ করলে অনিমেষ তেড়ে যায়। তখন তাকে ধাক্কা দিলে সে পুকুরে পড়ে যায়।
সকাল ১১টার দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করতে এসে কারও কাছ থেকে খবর পেয়ে বাবুল মোল্লার একতলা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে অনিমেষের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সোয়েটার, জুতা, মানিব্যাগ, গ্যাস লাইটার ও সিগারেট এবং ছাদের পাশে লাগোয়া একিট গাছের ওপর থেকে ট্রাউজার উদ্ধার করে।
বাবুল মোল্লা বলেন, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। কীভাবে আমার বাড়ির ছাদের ওপর অনিমেষের জিনিসপত্র এলো, ভেবে পাচ্ছি না। সকালে লোকজনের চেঁচামেচিতে ঘুম থেকে জেগে উঠে বিষয়টি জানতে পারি। কেউ অনিমেষকে মেরে আমাকে ফাঁসানোর জন্যই আমার বাড়ির ছাদে এসব রেখেছে।
অনিমেষের সাথে তার কোনো বিবাদ ছিল না বলে দাবি করেন বাবুল মোল্লা।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অনিমেষকে শ্বাসরোধে হত্যার পর আত্মহত্যার বলে চালিয়ে দিতে লাশ বাড়ি থেকে দূরে বাবুল আক্তারের নিম গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিস্তারিত জানা যাবে তদন্তের পর।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ আব্দুল মালেক মল্লিক, তার ভাই অহিদ মল্লিক ও জিল্লুর রহমান নামে এক চায়ের দোকানদারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে।
আশাশুনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নোমান হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা এখনও বলা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. রাহুল দেব রায় বলেন, অনিমেষকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
খবর পেয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (তালা সার্কেল) মো. হাসানুজ্জামান, দেবহাটা সার্কেল অফিসার হাসানুর রহমান ও সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে ময়না তদন্ত শেষে অনিমেষের লাশ তার স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
