।।মতামত।।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, দেশের শক্তির একটি প্রধান স্তম্ভ, বর্তমানে এক নতুন অন্তর্নিহিত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভাজন দেখা দিয়েছে, যার ফলে তিনটি পৃথক শক্তির কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, প্রতিটির নেতৃত্বে একজন শীর্ষস্থানীয় জেনারেল রয়েছেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, সেনাবাহিনী থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করা হয়েছিল, কিন্তু এখন তারা নিজস্ব অন্তর্নিহিত অস্থিরতা মোকাবিলা করছে।
একাধিক শক্তির কেন্দ্রের উত্থান
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সেনাবাহিনীতে অন্তর্কোন্দল সৃষ্টি হওয়ায় বর্তমানে তিনটি শক্তির কেন্দ্র উত্থিত হয়েছে। যদিও পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সংকটে পরিণত হয়নি, তবুও আওয়ামী লীগ সমর্থিত জেনারেলদের এবং ইসলামি গোষ্ঠী সমর্থিত জেনারেলদের মধ্যে উত্তেজনা সেনাবাহিনীর কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলছে।
বর্তমান সেনাপ্রধান, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, একজন মাঝারি পথের নেতা হিসেবে পরিচিত এবং তিনি বর্তমানে সেনাবাহিনী পরিচালনা করছেন। তবে, তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে দুইটি শক্তির কেন্দ্র উঠে এসেছে। একটি কেন্দ্রের নেতৃত্বে আছেন জেনারেল মোহাম্মদ শাহিনুল হক, যাকে সমর্থন করছেন মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মঈন খান, যিনি ৯ নম্বর ডিভিশনের অধিনায়ক। এই ডিভিশনটি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে পরিচিত এবং আওয়ামী লীগে আনুগত্যের জন্য পরিচিত।
অন্যদিকে, ইসলামী গোষ্ঠীর সমর্থিত একটি কেন্দ্রের নেতৃত্বে আছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান। তিনি ইসলামি হার্ডলাইনারদের সাথে সম্পর্কিত, যার মধ্যে রয়েছেন হিজবুত তাহরীরের মোহাম্মদ ইউনুসের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং কিছু ছাত্রনেতা। ফাইজুর রহমান এর আগে সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা, ডিজিএফআই-এর প্রধান ছিলেন।
বিদ্রোহের ঝুঁকি
সেনাবাহিনীর মধ্যে এ উত্থানশীল শক্তির কেন্দ্রগুলো কিছুটা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। একাধিক রিপোর্টে বলা হচ্ছে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফাইজুর রহমান ঢাকা ত্যাগের পর সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে অপসারণের পরিকল্পনায় জড়িত থাকতে পারেন। এছাড়া, যদি মুহাম্মদ ইউনুস শিগগির ঢাকা ত্যাগ করেন এবং তার পদ থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে ফাইজুর রহমান সেনাপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করতে পারেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
এই আভ্যন্তরীণ উত্তেজনা এবং শক্তির সংঘর্ষ সেনাবাহিনী এবং দেশটির স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের ইতিহাস
বাংলাদেশের ইতিহাসে অভ্যুত্থান নতুন কিছু নয়। ১৯৮০-এর দশকে দেশে রাজনীতির অস্থিরতা ছিল চরমে, যেখানে একের পর এক সেনা অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটেছিল।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ হাসিনার পিতা, সেনাবাহিনীর এক অভ্যুত্থানে নিহত হন, এবং এই ঘটনার পর দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক শাসন চলে। পরবর্তীতে আরও দুটি অভ্যুত্থান ঘটে এবং ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেন। তবে, জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয় ১৯৮১ সালে, যখন তিনি চট্টগ্রামে একটি সরকারি গেস্ট হাউসে অবস্থান করছিলেন। যদিও ছোট একটি সেনা দলের দ্বারা এই হামলা চালানো হয়েছিল, সেনাবাহিনী তাদের আনুগত্য বজায় রেখে বিদ্রোহ ঠেকায়।
এরপর, আব্দুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট হন, কিন্তু তাকে একটি রক্তহীন অভ্যুত্থানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরিয়ে দেন এবং পরে তিনি সামরিক আইন প্রধান হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন, যিনি পরে রাষ্ট্রপতি হন।
এই অভ্যুত্থানমূলক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে, বর্তমান সেনাবাহিনীর অন্তর্নিহিত উত্তেজনা এবং শক্তির কেন্দ্রের উত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় নতুন একটি অধ্যায় যোগ করতে পারে।
