অজয় বাঙালী
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ওসির সামনেই এক পুলিশ উপপরিদর্শককে (এসআই) পুড়িয়ে হত্যার দাবি ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সহিংসতা, পুলিশ হত্যা এবং সে–সংক্রান্ত দায়মুক্তি অধ্যাদেশ। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি এবং এরপরও পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়াকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি শায়েস্তাগঞ্জে ‘ডেভিল হান্ট ফেজ–২’ অভিযানে আটক ছাত্রলীগের এক সাবেক নেতাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালামের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
যে পরিকল্পনায় ছাড়িয়ে নিয়ে আসা হয়
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব ও আন্দোলনকালীন সময়কালের সমন্বয়ক মাহদী হাসানের সাথে বানিয়াচংয়ের এক সমন্বয়কের কথপোকথন বিডি ডাইজেস্টের কাছে এসেছে।
মাহদী হাসান ওসি’কে হুমতি ও ভয় দেখিয়ে চলে যাওয়ার পরে সেখানের পরিস্থিতির আপডেট দিয়ে বানিয়াচংয়ের সমন্বয়ক জানান, ‘ওসি মাফ চেয়েছে, (ওসিকে) লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়ে এসেছি। সেখানে এএসপি এসেছে, তারপরে সবাই ঠান্ডা হয়েছে’।
এভাবে প্রকাশ্যে পুলিশ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করার পরে ভয়ের কাছে নত স্বীকার করে পুলিশ প্রশাসন।
যা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।
ভিডিওতে মাহদী হাসানকে বলতে শোনা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কারণেই বর্তমান প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বানিয়াচং থানায় অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে পুড়িয়ে হত্যার সঙ্গে তাঁরাই জড়িত ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে বানিয়াচং উপজেলার কলিমনগর এলাকা থেকে এনামুল হাসান নয়ন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় নেওয়া হয়। নয়ন আগে শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা থানায় এসে তাঁকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার শহিদুল হক মুন্সীর মধ্যস্থতায় নয়নকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে মাহদী হাসান দাবি করেন, নয়ন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জুলাই আন্দোলনের সময় সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের সঙ্গে সম্মুখ সারিতে আন্দোলনে অংশ নেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও দেখানোর পর পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।
অন্যদিকে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালাম জানান, নয়নের জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ততার প্রমাণ দেখানোর পর এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পরে যেভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার এসআই সন্তোষ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বানিয়াচংয়ে পুলিশের গুলিতে অন্তত আটজন গ্রামবাসী নিহত হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ থানা ঘেরাও করে। এ ঘটনায় বিস্তৃত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে বিবিসি বাংলা।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, থানা আক্রমণ, অস্ত্র লুট ও অগ্নিসংযোগের একপর্যায়ে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য থানার ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দিনভর সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে উত্তেজিত জনতার দর–কষাকষির পর গভীর রাতে পুলিশের সদস্যদের উদ্ধারের সময় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাঁকে থানা চত্বরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন তাঁর মরদেহ থানার সামনে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিক্ষুব্ধ জনতা শুরুতে সব পুলিশ সদস্যকে হত্যার হুমকি দিলেও একপর্যায়ে সন্তোষ চৌধুরীকেই একমাত্র দাবি হিসেবে সামনে আনে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় বাকি পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করা হলেও সন্তোষকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সেদিন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কয়েক মিনিট দেরি হলে থানা ভেতরে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। সন্তোষ চৌধুরীর বিরুদ্ধে সেদিন গুলি চালিয়ে গ্রামবাসী হত্যার অভিযোগ তোলা হয়। পাশাপাশি তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ ছিল বলে বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। কেউ কেউ বলেন, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় একাংশ তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল।
এসআই সন্তোষ চৌধুরী ছিলেন পরিবারের একমাত্র সন্তান। মৃত্যুর ১০ মাস আগে তাঁর বিয়ে হয়। মৃত্যুর তিন মাস পর তাঁর একটি সন্তান জন্ম নেয়। পরিবার আজও প্রশ্ন তুলছে, সেনা ও প্রশাসনের উপস্থিতিতেও কেন তাঁকে রক্ষা করা গেল না।
বানিয়াচং থানায় হামলা ও এসআই হত্যার ঘটনায় গত বছরের ২২ আগস্ট পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলেও এক বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি, কোনো গ্রেপ্তারও হয়নি বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে আইন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি নির্দেশনার মাধ্যমে জুলাই–আগস্টের ঘটনাবলিতে জড়িতদের একপ্রকার দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে কার্যত স্থবির করে রেখেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, কোনো ফৌজদারি অপরাধে দায়মুক্তি দেওয়া সাংবিধানিকভাবে টেকসই নয়। তাঁর মতে, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বিচার হতে পারে, কিন্তু বিচার ছাড়া হত্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। মানবাধিকার আইনজীবী এলিনা খানও বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, চার্জশিট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন থাকা জরুরি, কারণ এসব ঘটনাই ভবিষ্যতের ইতিহাস হয়ে থাকবে।
বিবিসি বাংলা’কে এই বক্তব্য দেওয়ার কিছুদিন পরেই এক সাংবাদিক সম্মেলন থেকে গ্রেফতার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমিনুল হকের দাবি, ভিন্নমত দমনের জন্যেই সরকার এই গ্রেফতার নাটক সাজিয়ে একজন আইনের অধ্যাপককে মিথ্যা মামলায় কারাগারে ঢুকিয়েছে।
সরকারি হিসাবে, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের সহিংসতায় বাংলাদেশ পুলিশের অন্তত ৪৪ জন সদস্য নিহত হন। অনেক ক্ষেত্রেই থানায় বা প্রকাশ্যে পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার ও তদন্তের অগ্রগতি না থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
ওসির সামনে এসআই হত্যার প্রকাশ্য দাবির পরও কোনো তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ায় দায়মুক্তি অধ্যাদেশের প্রভাব এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সীমাবদ্ধতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
