নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২৫ জুলাই ২০২৫।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি এবং সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় তীব্র সমালোচনা উঠেছে। সম্প্রতি মোহাম্মদপুরে একজন সাংবাদিকের ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই ঘটনায় পুলিশের চার সদস্যকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও, দেশজুড়ে অরাজকতা, হত্যা, লুণ্ঠন এবং সন্ত্রাসের ঘটনা অব্যাহত থাকায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মোহাম্মদপুর থানার ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক আহমাদ ওয়াদুদ ফেসবুকে তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ছিনতাইকারীদের দেখিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও এসআই আনারুল কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনকি ওসি তাঁকে বলেন, “আমি ওসি হয়েও কম দামি ফোন ব্যবহার করি, আপনি এত দামি ফোন নিয়ে ঘুরলে ছিনতাই তো হবেই!”
এই ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর বাংলাদেশ পুলিশ তড়িঘড়ি করে চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে উপ-পুলিশ কমিশনার অফিসে সংযুক্ত করে এবং ছিনতাই হওয়া মোবাইল উদ্ধারসহ তিনজন আসামিকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়।
এ ধরনের ঘটনা কেবল তখনই তদন্ত ও বিচারের আওতায় আসছে যখন তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে, যেমন মিটফোর্ডে পাথর দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ভাইরাল হওয়াতে ২ দিনের মধ্যে অপরাধীরা গ্রেফতার হয়। এর বাইরে শত শত মব সন্ত্রাস, ধর্ষন, অরাজকতা, হত্যা, এবং লুণ্ঠনের ঘটনা অজানা থেকে যাচ্ছে, যার কোনো তদন্ত বা পুলিশি পদক্ষেপ নেই।
এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যাপকভাবে জড়িত করা হয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনা ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার সেনাবাহিনীকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা প্রদান করে, যা তাদের গ্রেপ্তার, তল্লাশি এবং অবৈধ সমাবেশ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। এই ক্ষমতা ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীতে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্যও প্রসারিত করা হয়, যা বর্ধিত হতে হতে ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা বেড়েছে। সংগঠনটি সুপারিশ করেছে, সেনাবাহিনীকে বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা এবং বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রতিবেদন ও তদন্তের ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হয়, যার ফলে অনেক পুলিশ সদস্য দায়িত্বে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। এই শূন্যতা পূরণে সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সেনা হস্তক্ষেপ ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করতে পারে এবং জনগণের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত নির্ভরতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল না হলে অপরাধের বিচার না হওয়া পুলিশ বাহিনীর ব্যর্থতার প্রমাণ।” তিনি আরও বলেন, “সেনাবাহিনীকে তাদের মূল দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।”
দেশে অরাজকতা, হত্যা, এবং লুণ্ঠনের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অথচ কেবল ভাইরাল ঘটনাগুলোই আইনি ব্যবস্থার আওতায় আসছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এবং সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রবণতাকে প্রকাশ করে। সরকারের উচিত পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করা, সেনাবাহিনীর ভূমিকা সীমিত করা, এবং স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। অন্যথায়, এই অরাজকতা দেশকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
