২১ আগস্ট মামলার রায় ইতিহাসের ঘৃণ্যতম কালো অধ্যায়, বিবৃতি আওয়ামী লীগের

২১ আগস্ট মামলার রায় ইতিহাসের ঘৃণ্যতম কালো অধ্যায়, বিবৃতি আওয়ামী লীগের
শেয়ার করুন
সংবাদ প্রতিবেদন

বাংলাদেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটি ‘একটি জঘন্য ও ঘৃণ্যতম কালো অধ্যায়’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে একুশে আগস্ট হামলা মামলার আজকের এই রায়, বিবৃতিতে জানিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যা ও পাঁচ শতাধিক আহত হওয়ার মামলায় হাই কোর্টের রায়ে আসামিদের সবাইকে খালাস দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটি।

রোববার ১লা ডিসেম্বর, আওয়ামী লীগের ফেসবুক পাতায় রায়ের প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিচারিক আদালতে দণ্ডিত সকল আসামিকে সংবিধান, আইন ও সকল বিচারিক রীতিনীতি লংঘন করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে খালাস করে বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ মনে করে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটি একটি জঘন্য ও ঘৃণ্যতম কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানোর মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ দেশি-বিদেশি জঙ্গী, তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তাসহ সকল আসামিকে খালাস দিয়েছে হাই কোর্ট।

আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি করে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ ওই রায় দেয়। জজ আদালত এ মামলায় ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১১ পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছিল। অভিযোগ গঠনে ‘ত্রুটিকে’ আসামিদের সবাইকে খালাস দেওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে হাই কোর্ট বেঞ্চ।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, মুফতি আব্দুল হান্নানের জবানবন্দির ভিত্তিতে যে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে এ মামলার বিচার শুরু হয়েছিল, সেই অভিযোগপত্রই ছিল ‘অবৈধ’। এছাড়া কোনো সাক্ষী কোনো আসামিকে গ্রেনেড ছুড়তে ‘দেখেননি’, তাই শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া যায় না বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে কোর্ট।

বিএনপি-জামায়াতের সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর সহিংসতা এড়াতে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। এছাড়া আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী হত্যার শিকার হন। অনেকে প্রাণ বাঁচাতে আত্মগোপনে রয়েছেন। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে নানারকম মামলায়। আওযামী লীগের পক্ষ থেকে এসব মামলাকে ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট বলে দাবি করা হয়েছে।

শতাধিক হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে শেখ হাসিনার নামেই। একই মামলার এজাহারে আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে কয়েকশ নেতা-কর্মীর নাম। রয়েছে অজ্ঞাতনামা অসংখ্য ব্যক্তি। ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে ইচ্ছেমত গ্রেপ্তার করে পরে মামলায় আসামি হিসেবে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।

তবে এত হত্যা-নির্যাতন এবং দমন-পীড়নের পরেও গত চার মাসে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা ধীরে ধীরে সংগঠিত হচ্ছেন বলে শঙ্কিত অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের ‘স্টেকহোল্ডাররা’। দেশে এবং বিদেশে নেতা-কর্মীরা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়েছেন। সেইসাথে রাজপথেও তারা মিছিল করছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল পেজ থেকেও নিয়মিত বিভিন্ন ইস্যুতে নেতৃবৃন্দের বিবৃতি প্রকাশিত হচ্ছে।

‘একুশে আগস্ট মামলার সকল আসামিকে খালাসের ঘটনায় আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ’ শিরোনামে রোববারের বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে পবিত্র সংবিধান রচিত হয়েছিল, তাতে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। আজ একুশে আগস্ট মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত ৪৯ জন আসামির সকলকে খালাস করে এই অসাংবিধানিক ও অবৈধ তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকার পবিত্র সংবিধানের ওপর কুঠারাঘাত করল।

মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগ এটি স্মরণ করিয়ে দিতে চায়, ২১শে আগস্ট নারকীয় গ্রেনেড হামলার পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নির্দেশে তদানীন্তন পুলিশ এই মামলা গ্রহণ করেনি। এই ভয়ানক গ্রেনেড হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধের হীন উদ্দেশ্যে তারা জজ মিয়ার নাটক সাজিয়েছিল।

পরবর্তীতে এক-এগারোর সরকারের সময় ২০০৭ সালে এ-সংক্রান্ত মামলা দুটির (হত্যা ও বিস্ফোরক) তদন্ত নতুনভাবে শুরু করে। এক এগারোর সরকারের দ্বিতীয় বছর অর্থাৎ ২০০৮ সালে তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

অভিযোগপত্রের কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ বলছে, শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই হামলা চালানো হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বিচারিক আদালত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে গ্রেনেড হামলাকারী খুনি, এই হত্যাকাণ্ড ও হামলার পরিকল্পনাকারী, নির্দেশ দাতাদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ ক্রমে বিচার সম্পন্ন করে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আদালত দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ন্যায় বিচারের সকল আইনি, বিচারিক বিধি বিধান ও রীতিনীতি প্রতিপালন করে এই মামলার বিচার সম্পন্ন করে। অসাংবিধানিক ও অবৈধ তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে হাই কোর্টের একটি বিভাগ সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও বেআইনিভাবে বিচারিক আদালতের রায় উদ্ভূত ডেথ রেফারেন্স নাকচ করে এবং আসামিদের আপিল মঞ্জুর করে একুশে আগস্ট নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও গ্রেনেড হামলার বিচার বন্ধ করার উদ্দেশ্যে এই প্রহসনমূলক রায় দেয়।

হাই কোর্ট বেঞ্চ ‘প্রহসনমূলক ফরমায়েশি রায়’ দিয়েছে অভিযোগ করে বেঞ্চের একজন বিচারকের সঙ্গে বিএনপির ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ থাকার অভিযোগ এনেছে আওয়ামী লীগ।

বিবৃতিতে বলা হয়, ৫ই আগস্টের পর দেশের বিচার বিভাগ ধ্বংসসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও খাত ধ্বংস করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, আজ ২১শে আগস্ট মামলার রায় বাতিল করে সেটিই প্রমাণ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ আরও বলেছে, অসাংবিধানিক ও অবৈধ তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারকে আহ্বান জানাবো, দেশ ধ্বংসের যে উন্মত্ত খেলায় আপনারা মেতে উঠেছেন সেগুলো এখনই বন্ধ করুন। ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তে লেখা এই সংবিধান আপনাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাস আপনাদের ক্ষমা করবে না।

Visited 26 times, 1 visit(s) today