সংবাদ প্রতিবেদন
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪’-এ অংশগ্রহণকারী অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ব্যবসায়ী নেতারা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দেন।
সম্মেলনে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকায় বসে আছে, তাদের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। মাঠে থাকা জরুরি ছিল, বিশেষ করে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা ও বাজার পরিস্থিতি মনিটরিং করার জন্য।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান আরো বলেন, দেশে দৃশ্যমান দুর্নীতি কিছুটা কমলেও কর্মক্ষেত্রে গতির অভাব দেখা যাচ্ছে। হয়রানি দুর্নীতি ভয়ানক পর্যায়ে চলে গেছে, যা উপদেশ দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়—এর কার্যকর মনিটরিং প্রয়োজন। বাজার পরিস্থিতির নজরদারি ও মনিটরিংয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে, যা জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, মনিটরিং শুধু সাজা দেওয়ার জন্য নয়, বরং এটি আগাম তথ্য সংগ্রহ ও সমস্যাগুলোর সমাধানের একটি পদক্ষেপ।
অর্থনৈতিক ভারসাম্য, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কর্মসংস্থান, এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোতেও সরকারের মনোযোগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মতামত ব্যক্ত করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, সরকারের কোনো ব্যক্তিগত এজেন্ডা নেই; বরং দেশীয় স্বার্থেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের কাজগুলোকে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে ভাগ করেছি। কিছু দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নতুন সরকার সম্পন্ন করবে, তবে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতে চাইছি।
তিনি গ্রামের দরিদ্র মানুষদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বাণিজ্য ও পাট উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে, তা প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির সমস্যা সমাধানের জন্য দেশের সাপ্লাই চেইনে বাধাগুলো দূর করে বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হবে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারকে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে জনগণের সঙ্গেও সংযোগ রাখা উচিত বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিক সংকটে নেই এবং অর্থনীতির অগ্রগতি থেমে যায়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক খাতকে মজবুত করতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে এবং অর্থ পাচার রোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে আমরা নগদ সহায়তার উপর নির্ভর না করে কার্যকর মুদ্রানীতির উপর গুরুত্ব দিচ্ছি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের অভাবকে আউট-অফ-পকেট ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন পেতে হলে বাজেট বরাদ্দে পরিবর্তন আনতে হবে এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পেতে হলে শিক্ষাখাতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
তার মতে, বৈষম্য কমাতে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন আনতে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু দেশের বর্তমান সংকটের জন্য সংকোচিত মুদ্রানীতিকে দায়ী করেন।
তার মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারি নীতি-কৌশলে পরিবর্তন আনা উচিত।
তিনি বলেন, দেশে সম্পদ সৃষ্টিকারী এবং সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, যা সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, নিত্যপণ্যের ওপর শুল্ক ছাড়সহ জনগণের স্বার্থে এনবিআর নীতি প্রণয়ন করছে। তবে জনগণের মধ্যে মিথ্যা হলফনামা দাখিলের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সম্মেলনে বক্তারা দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে আরও গতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
