হাসান মাহমুদ টিপু
সরকারের কোথাও হিন্দু ও অন্যান্য মাইনরিটি গ্রুপ আছে?
উত্তরঃ নাই।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ধর্মীয় ও নৃ-তাত্বিক সংখ্যালঘুরা তাদের স্বীকৃতি ও অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করে গেলেও তাদেরকে কোনভাবেই শান্তিতে বসবাসের পরিবেশ কোন সরকারই দিতে পারে নাই। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক আর্মি ও এদেশীয় রাজাকার, আলবদর, আল শামস, ও বিহারীদের প্রধানতম শত্রু ছিল হিন্দুরা। তারপর “জয় বাংলা”র লোক তথা মুক্তিবাহিনী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। “ভারতের দালাল” উপাধি দিয়ে যুদ্ধের ৯ মাসের পুরো সময় হিন্দুদের উপর চলেছে হত্যাকান্ড, নির্যাতন, এবং নারীদের “গনিমতের মাল” বলে ধর্ষণ এবং শারীরিক নির্যাতন। যুদ্ধকালীন সময় বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশী ১ কোটি শরনার্থীদের মেজরিটি ছিল হিন্দু ধর্মের। কী ভয়ংকর অত্যাচারের শিকার হয়ে তাদেরকে ভারতে চলে যেতে হয়েছিল একবার ভাবুন! বাড়ি-ঘর, সহায় সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে রাজাকারদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে চলে যেতে হয়েছিল ভারতে। আবার অনেকে যুদ্ধ শেষে ফেরার আশায় সব ফেলে চলে গেছিল। স্বাধীনতার পর ফিরে এসে দেখে তাদের সম্পত্তি দখল হয়ে গেছে। ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে Vested Property Act চালু ছিল। এর অর্থ শত্রুর সম্পত্তি দখল করার অধিকার ছিল সরকারের। এই আইনের খেসারত হিন্দুদের দিতে হয়।
তানভীর মোকাম্মেলের “চিত্রা নদীর পাড়ে” সিনেমা দেখলেও বুঝতে পারবেন হিন্দুদের ভয়ানক সময় কাঁটানোর ঘটনা। হুমায়ুন আহমেদের “আগুনের পরশমনি” উপন্যাস ও সিনেমায় তিনি বর্ণনা করেছেন কিভাবে পাক আর্মি ও রাজাকারেরা পুরুষদের কাপড় খুলে “ধর্ম” চেক করতো। মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ নিহতদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল প্রচুর। শরনার্থী শিবির ঘুরে সেইসব শরনার্থীদের অবর্ণনীয় জীবনগাথা নিয়ে আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ লিখলেন “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” নামের কবিতা যেটা ১৪ই নভেম্বর ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসে। পরে এই কবিতাকে গানে রুপান্তর করেন জর্জ হ্যারিসন, জোয়ান বায়েজ। আরো পরে বব ডিলান, এবং বাংলায় গাইলেন মৌসুমী ভৌমিক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতায় হিন্দুদের ভুমিকা ছিল অনস্বীকার্য। পাক আর্মি ও রাজাকারদের প্রধান শত্রু ছিল হিন্দুরা। অথচ যুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে তারাই এদেশে সব সময় “দ্বিতীয় শ্রেণির” নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত। তাদের ভালনারিবিলিটির কথা সব রেজিমেই শুনে আসছি। প্রতি বছর দূর্গা পুজা আসলেই মন্দির ভাঙ্গা ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা দেখতে পাই। ২০০১ সালে বিএনপি জামাত ক্ষমতায় আসলে পাঁচদিন ধরে চলে হিন্দুদের উপর অকথ্য নির্যাতন যা তাদের একাত্তরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মাস আকারে হিন্দু নির্যাতন, বিশেষ করে নারী ও নির্যাতনের কথা সেইসময়ের পত্রিকায় সিরিজ আকারে এসেছিল। পূর্নিমা নামের বাচ্চা একটা মেয়েও রক্ষা পায়নাই শয়তানদের লালসার শিকার থেকে। সেই সরকারের পুরো সময়ে হিন্দুদের সাথে বৈষম্য হলেও সেটা সহনীয় ছিল বর্তমান সরকারের হিন্দুদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের তুলনায়।
২০২৪ এর ৫ই আগস্টের পর এনজিও ও নোবেল ডক্টর সাহেবের নেতৃত্বে সরকার গঠনের আগে ও পরে হিন্দুরা শারিরীক নির্যাতন ও সিস্টেমেটিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। একাত্তরকে, মুক্তিযুদ্ধকে, বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে মুছে ফেলতে চাচ্ছে, একইভাবে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে “তৃতীয় শ্রেণীর” নাগরিক বানিয়ে তাদেরকে আরো বেশি মারজিনালাইজ করে এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছে এই সরকার। হিন্দুদের সাথে এই সরকারের ট্রিটমেন্ট “সিস্টেমেটিক জেনোসাইডের” নামান্তর হচ্ছে। ডক্টর সাহেবের ভয়েস অব আমেরিকায় সাক্ষাতকারে “বাংলাদেশের হিন্দুরা আওয়ামীলীগ করে বলে নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকতে পারে” বলার পর গতকাল ফাইনানশিয়াল টাইমের সাথে সাক্ষাতকারেও সেই কথার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিন্দু বা সনাতন ধর্মের মানুষের প্রতি স্পষ্ট বৈষম্য করছে। আমি আগেও বার দুয়েক লিখেছি কিভাবে হিন্দুদের প্রতি এই সরকার সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বৈষম্য করছে। কয়েকটা ঘটনা নিচে তুলে দিলাম আরো ভাল করে বোঝার জন্য।
তার আগে ছোট একটা পরিসংখ্যান দেই। বর্তমানে দেশে হিন্দু জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮.৫%! বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ১.১%! বাকী ৯০.৪% মুসলমান। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের আগে হিন্দুদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২২% ছিল। (সোর্স: Minority Rights Group)! মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক হিন্দু ফিরে আসলেও অনেকে ভারতে থেকে যায়। ফলে মুসলমানের তুলনায় হিন্দুর শতকরা হার কমতে থাকে। গত ৫৩ বছরে হিন্দুদের উপর বিভিন্ন ধরণের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রচুর হিন্দু ভারতে পাড়ি দিয়ে সেদেশে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
* অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদে একজন হিন্দু ও একজন আদিবাসীকে রাখা হয়েছে যাদের কোন কাজ নাই। দুইজনেই অর্নামেন্টাল হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদে আছেন।
– হিন্দুদের শতকরা হার: ০.০৫%
* প্রথম ঘটনা চোখে পড়ে যখন ৫৫ জনের সমন্বয়ে ৬ টি সংস্কার কমিশনে ১ জনও যোগ্য হিন্দুকে খুঁজে না পাওয়া।
– এখানে হিন্দুদের শতকরা হার ০%!
* সরকারে ৭৩ জন সচীব/সমমর্যাদাসম্পন্ন ও তধোর্ধ পদমর্যাদার কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র একজনকে পাওয়া গেল।
– শতকরা হার ০.০১৩৬%!
মজার ব্যাপার হলো আওয়ামীলীগ আমলে জামাত রিউমার ছড়াইছিল এবং প্রচুর শিক্ষিত মানুষ বিশ্বাসও করছিল যে “সরকারে ৪০০ জন সচিব হিন্দু ধর্মের”। পরে রিউমার স্ক্যান প্রমাণ করে দিছিল ৮৭ জন সচিব ও উচু মর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তার ৮২ জন মুসলমান।
* হাইকোর্টে ২৩ জন অস্থায়ী বিচারপতি নিয়োগে ১ জন হিন্দু পাওয়া গেল।
– হিন্দুদের শতকরা হার ০.০৪৩℅!
* সম্প্রতি আওয়ামীলীগ শাসনামলে নিয়োগ পাওয়া ট্রেইনিং এর শেষে পাসিং আউটের ঠিক আগের দিন ২৫২ জন সাব-ইন্সপেক্টরের নিয়োগ বাতিল করে দেয় সরকার। নিয়োগ বাতিলের দুইটা ক্রাইটেরিয়া ছিল: হিন্দু ধর্ম এবং ছাত্রলীগ লিংক। ফলে এই ব্যাচে যত হিন্দু ছিল (৯৬ জন) সবার চাকরি বাতিল হয়েছে।
– ১০০% হিন্দুকেই বাদ দেওয়া হয়েছে।
* এটর্নি জেনারেল বিএনপির নেতা যিনি মুসলমান। ৬৭ জন অতিরিক্ত ও ডেপুটি এটর্নি জেনারেলের মধ্যে ১ জন হিন্দু।
– হিন্দুদের শতকরা হার: ০.১৪৭%
* ১৫৭ জন সহকারী এটর্নি জেনারেলের মধ্যে কোন হিন্দু না। ১ জন আদিবাসি আছে, সে আমার ছাত্র প্রজ্জল চাকমা।
– হিন্দুদের শতকরা হার ০%!
বলে রাখা ভাল ডেপুটি ও সহকারী এটর্নি জেনারেলদের ৭০% জামাতে ইসলামীর। ড: আসিফ নজরুলকে আগামী ১০০০ বছর স্মরণ করবে জামাতিরা তাদেরকে ২০০০ বছর আগায়ে দেওয়ার জন্য।
* হাজার হাজার সরকারী কৌঁসুলি, অতিরিক্ত ও সহকারী কৌঁসুলি, পাবলিক প্রসেকিউটর, অতিরিক্ত ও সহকারী পাবলিক প্রসেকিউটরদের মধ্যে কতজন হিন্দু ধর্মের দেখলেই বুঝতে পারবেন।
– হিন্দুদের শতকরা হার ০.০০০৫% এর নিচে হবে।
এছাড়া সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়াদের হিসাব পর্যালোচনা করলে হিন্দু ধর্মের মানুষদের খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও মেম্বার সবাই মুসলমান। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেও কোন হিন্দু নিয়োগ পায় নাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও জাজ ও প্রসেকিউটর পদে কোন হিন্দু নিয়োগ পায় নাই। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোতে নতুন নিয়োগ পাওয়া উচু পদে কোন হিন্দু পাওয়া যাচ্ছে না।
যাইহোক, উপরের পরিসংখ্যান (সারা দেশের নিম্ন আদালতে নিয়োগ পাওয়া হাজার হাজার পাবলিক প্রসেকিউটরের তালিকা দেখি নাই। স্পেকুলেশন করেছি) দেখে কোন ধারণা করতে পারেন এই সরকারের উদ্দেশ্য কী? এই যে একটা জেনোসাইডের দিকে আগাচ্ছে বুঝতে পারছেন আপনারা?
১১ই ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৯৬ (১) রেজুলেশন এ বলা হয়েছে,
“Genocide is a denial of the right of existence of entire human groups, as homicide is the denial of the right to live of individual human beings; such denial of the right of existence shocks the conscience of mankind, …and is contrary to moral law and to the spirit and aims of the United Nations. …The General Assembly, therefore, affirms that genocide is a crime under international law…whether the crime is committed on religious, racial, political or any other grounds!”
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ The Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide (CPPCG) এডপ্ট করে। এই কনভেনশনের ২ অনুচ্ছেদে জেনোসাইডের সংগায় বলা হয়:
“Any of the following acts committed with intent to destroy, in whole or in part, a national, ethnical, racial or religious group, as such: killing members of the group; causing serious bodily or mental harm to members of the group; deliberately inflicting on the group conditions of life, calculated to bring about its physical destruction in whole or in part; imposing measures intended to prevent births within the group; [and] forcibly transferring children of the group to another group.”
Vahakn Dadrian তার A Typology of Genocide বইয়ে জেনোসাইডের সংগায় লেখেন,
“Genocide is the successful attempt by a dominant group, vested with formal authority and/or with preponderant access to the overall resources of power, to reduce by coercion or lethal violence the number of a minority group whose ultimate extermination is held desirable and useful and whose respective vulnerability is a major factor contributing to the decision for genocide.”
আবার, Irving Horwitz তার Genocide: State Power and Mass Murder বইয়ে জেনোসাইডের সংগায় লেখেন,
“Genocide represents a systematic effort over time to liquidate a national population, usually a minority…[and] functions as a fundamental political policy to assure conformity and participation of the citizenry.”
উপরের জাতিসংঘের ও স্কলারদের সংগায় দেখতে পাই যে সরকারের পলিসি বা কাজের মাধ্যমে কোন ধর্মীয় বা জাতিগত মাইনরিটি গ্রুপকে সরকারের বিভিন্ন কাজ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিরত রেখে তাদের অস্তিত্বকে ধ্বংস বা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়, সেটা জেনোসাইডের পর্যায়ে পড়বে। বর্তমান সরকার এই যে হিন্দুদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করছে যা মানবাধিকারের লংঘন। ১৯৪৫ সালে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে ২৪ জন নাৎসি নেতার বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডের পাশাপাশি ইহুদীদের বিরুদ্ধে এরকম জেনোসাইডের অভিযোগে দন্ডিত করা হয়েছিল। সাধু সাবধান! নাৎসি হয়ে উইঠেন না ডক্টর এন্ড গং!
ধন্যবাদ এই লেখা পড়ার জন্য।
** জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ফলকার টুর্ক এখন ঢাকায়। কেউ যদি তার কোন মিটিং এ উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পান তাকে সরাসরি প্রশ্ন করুন যেন অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনে।
সহকারী অধ্যাপক,
আইন বিভাগ
কার্লটন ইউনিভার্সিটি
অক্টোবর ৩০, ২০২৪!
অটোয়া, কানাডা।
Visited 28 times, 1 visit(s) today
