জুলাই ষড়যন্ত্রে নিহতের সংখ্যা কমলো কেন, প্রথম আলো ঘেরাও

জুলাই ষড়যন্ত্রে নিহতের সংখ্যা কমলো কেন, প্রথম আলো ঘেরাও
শেয়ার করুন

নিউজ ডেস্ক:

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায়। সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জুলাই ষড়যন্ত্রের শুরু থেকে ৩রা আগস্ট পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩৪৬, যা সমন্বয়কদের অতিরঞ্জিত ২ হাজার মৃত্যুর দাবির এক-চতুর্থাংশেরও কম। এ সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রথম আলো কার্যালয় ঘেরাও এবং মানববন্ধন করেছে ‘শিক্ষার্থী’ নামধারী একটি গোষ্ঠী, যারা জুলাই ষড়যন্ত্রের সমর্থক প্রতীয়মান হয়।

এদিকে পুলিশের তিন হাজারেরও অধিক মৃত্যু নিয়ে কারো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছেনা। এ নিয়ে খোদ পুলিশের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও প্রকাশ্যে আসছেনা কোনো কিছুই। দিন দিন বরং নিহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছেই। এর পেছনে কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে সচেতন মহল। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নিহতের সংখ্যা বাড়ালে ‘লাভ’। কারণ ইতিমধ্যে প্রতিটি নিহতের পরিবারকে ৩০ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদানের ঘোষণা করেছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও পুলিশ এই তালিকায় ঠাঁই পায়নি। তবে ৩০ লাখ টাকা নিঃসন্দেহে বড় অংক। এই নিহতের তালিকা যত বড় হবে, অজ্ঞাত কুলশীলদের হিসেবে যত মানুষ এই তালিকায় যুক্ত করা যাবে, কেউ না কেউ তাতে লাভবনা হবেন, বলাই বাহুল্য।

প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদন যাদের পরিকল্পনার বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছে, তাদের সাথে মানববন্ধন ও পত্রিকার কার্যালয় ঘেরাও দানকারীদের সম্পর্ক রয়েছে কিনা, আদৌ থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, এমনটাই বলছেন নেটিজেনরা। সেই সাথে প্রশ্ন উঠেছে, ৮ই আগস্ট পর্যন্ত সকল হত্যাকাণ্ডের নিরপক্ষ তদন্ত করতে দেওয়া হয়নি কেন, কেন তার আগেই তড়িঘড়ি করে ইনডেমনিটি দেওয়া হলো? কাদের বাঁচাতে এই ইনডেমনিটি? তদন্তে অসুবিধা হতো কার? তাছাড়া জাতিসংঘের তদন্ত দলের কাজের অগ্রগতিই বা কতদূর? আড়াই মাস পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হলো না? কেন ‘লাশের সংখ্যা’ নিয়ে এমন ঢাক ঢাক গুড় গুড়?

এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদন কী বলছে?

বৃহস্পতিবার, ২৪শে অক্টোবর হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এর প্রকাশিত প্রতিবেদন জানিয়েছে, জুলাই ষড়যন্ত্রকালে সহিংসতায় দেশজুড়ে ৯৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে ৮৬৮ জনের নাম-পরিচয় জানা গেলেও ১১৮ জন অজ্ঞাতপরিচয়। নিহতদের তথ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

এইচআরএসএস জানিয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, হাসপাতাল ও জাতীয় দৈনিকগুলোর সূত্র থেকে এসব মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া গণমাধ্যম, হাসপাতাল ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে যেসব বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে অনুমান- নিহতের সংখ্যা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মিলে কমপক্ষে ১২০০ হবে। এতে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, শিশু ও নারী এবং রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থক রয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ১২৭ শিশু (১৮ বছরের নিচে), ৬ সাংবাদিক, ৫১ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং নারী রয়েছেন।

এইচআরএসএসের তথ্যমতে, ৯৮৬ জনের মধ্যে ১৬ই জুলাই থেকে ৩রা আগস্ট পর্যন্ত ৩৪৬ জন এবং ৪ঠা আগস্ট থেকে ১৪ই অক্টোবর পর্যন্ত ৬৪০ জন নিহত হয়েছেন। শুধু ৭ দিনে (১৮-২০শে জুলাই ও ৪-৭ই আগস্ট) ৮৫২ জন নিহত হয়েছেন। ৫ই আগস্ট কমপক্ষে ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন। ১৬ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট সারাদেশে কমপক্ষে ৭৭২ জন নিহত হন। ৬-৮ই আগস্ট দুদিনে ১৬৪ জন নিহত হয়েছেন। ৯ই আগস্ট থেকে ১৪ই অক্টোবর পর্যন্ত কমপক্ষে ৪৯ জন মারা গেছেন।

এইচআরএসএস বলেছে, নিহতদের মধ্যে ৮৭৯ জনের মৃত্যুর ধরন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৭% বা ৬৭৯ জন গুলিতে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ১০% বা ৯১ জন আগুনে পুড়ে এবং ১০% বা ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে পেটানোর কারণে। অন্যান্য কারণে ৩% বা ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মৃতদেহে গুলির দাগ দেখে ৬৬০ জনের মৃত্যুর পেছনে এইচআরএসএস পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়ী করেছে। তাদের দাবি, পুলিশের হাতে ৫১৮ (৭৮%) জন, র‌্যাব, সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ৫২ জন, রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে ৫২ জন এবং শিক্ষার্থীদের হাতে গণপিটুনিতে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে গুলির আঘাতের ব্যাপারে বিভিন্ন সূত্র বিভিন্ন কারণ দায়ী করে ইতিমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে নানা তথ্য তুলে ধরেছেন। যাতে দেখা যাচ্ছে, জুলাই ষড়যন্ত্রের স্টেকহোল্ডার কিংবা মাস্টারমাইন্ডদের নির্দেশে গোপন স্থান থেকে স্নাইপার রাইফেলে গুলি চালিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে বিপাকে ফেলতে ও আন্দোলনকে উস্কে দেওয়ার কাজে অনেকেই জড়িত ছিলেন। যাদের মধ্যে বরখাস্তকৃত অনেক সেনাসদস্য জড়িত বলে অনেক ‘সচিত্র তথ্য’ সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে।

এইচআরএসএস বলেছে, নিহত ৯৮৬ জনের মধ্যে ৭৬০ জনের বয়স সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪ বছরের আহাদ, ৬ বছরের রিয়া গোপসহ প্রায় সব বয়সী মানুষই রয়েছেন। ৭৬০ জনের মধ্যে ১৮ বছরের কম, যাদের শিশু বলা হয়েছে, এমন ১২৭ (১৭%), তরুণ বয়সী ৪১৮ (৫৫%), মধ্যবয়সী ১৮১ (২৪%) ও বয়স্ক ব্যক্তি আছেন ৩৪ (৪%) জন। নিহতদের মধ্যে ৫৫৬ জনের পেশা নিয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ২৬৫ (৪৮%), শ্রমজীবী ১৩৩ (২৪%), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ৫১ (৪%), বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী ৪১ (৭%) জন এবং অন্যান্য পেশায় রয়েছেন ৬৬ (১২%) জন। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ৭১% এর বেশি।

এইচআরএসএস জানিয়েছে, ৯৮৬ জনের মধ্যে ১৬ই জুলাই থেকে ৩রা আগস্ট পর্যন্ত ৩৪৬ জন এবং ৪ঠা আগস্ট থেকে ১৪ই অক্টোবর পর্যন্ত ৬৪০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬১৪ জন, চট্টগ্রামে ১০৪, খুলনায় ৮০, রাজশাহীতে ৬৫, ময়মনসিংহে ৪৪, রংপুরে ৩৫, সিলেটে ২৩ এবং বরিশাল বিভাগে আছেন ১২ জন।

Visited 24 times, 1 visit(s) today