নিজস্ব সংবাদদাতা:
‘আজ যদি আমরা রুখে না দাঁড়াই, তবে কখন? যেভাবে নিধনযজ্ঞ, নিপীড়ন চালানো হচ্ছে আমাদের ওপর, তাতে আগামীকাল তো আর কেউ থাকব না’- এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানালেন অনুতোষ মন্ডল। শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন, কিন্তু কর্মপরিবেশ আর আগের মত নেই, তাই চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানালেন। অনুতোষের মত অগুণিত সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বী আজ সমবেতন হয়েছেন বীর চট্টলার ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে।
আমার মাটি আমার মা, এ দেশ ছেড়ে কোথাও যাবো না; দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেবো রক্ত, রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়; কুরুক্ষেত্রের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার; হর হর মহাদেব, জয় শ্রী রাম, জয় শ্রী কৃষ্ণ- স্লোগানে লাখ লাখ সনাতনী সম্প্রদায়ের মানুষ মহাসমাবেশ করেছেন লালদিঘী ময়দানে। এসময় ধর্মের নামে নির্যাতন বন্ধ না হলে এবার প্রতিরোধ করা হবে এবং সনাতনীদের এদেশ থেকে উৎখাতের চেষ্টা হলে পরিণতি হবে ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
সকল সনাতনী সংগঠন ও সনাতনীদের ঐক্য মোর্চা ‘বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ’ বাংলাদেশের হিন্দুদের মঠ-মন্দিরে হামলা বাড়িঘরে লুট, অগ্নিসংযোগ, হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় চাকরি থেকে অব্যাহতিসহ হিন্দু নির্যাতনের প্রতিবাদে ৮ দফা দাবিতে শুক্রবার এ মহাসমাবেশের আয়োজন করে।
দুপুর থেকেই নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং আশপাশের উপজেলা থেকে সনাতনী সম্প্রদায়ের মানুষের মিছিল লালদিঘী মাঠে এসে জমায়েত হয়। বিকেল ৩টার পর সনাতনী সম্প্রদায়ের জনস্রোতে লালদিঘী মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে। মঞ্চে বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের সাধুসন্তরা বক্তব্য রাখছিলেন। বিকেল ৪টায় লালদিঘী, সিনেমা প্যালেস, জেলা পরিষদ ভবন, কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনের সড়ক, নবগ্রহ বাড়ি সড়কে ছড়িয়ে পড়ে মহাসমাবেশে আগত সনাতনীদের উপস্থিতি।
বিভিন্ন উপজেলা এবং নগরীর পাড়া-মহল্লাগুলো থেকে আসা মিছিলের অগ্রভাগে ছিল নারীদের বিপুল উপস্থিতি। এছাড়া প্রতিটি মিছিলেই বয়স্ক নারী-পুরুষের পাশাপাশি কিশোর তরুণদের আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মত। স্লোগানে প্রকম্পিত করে তুলেছেন তারা চারদিক।
স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে বড় এই সনাতনী সম্প্রদায়ের সমাবেশে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হন।
বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী বলেন, যে মঞ্চ থেকে স্বাধীনতার ৬ দফা দাবি উঠেছিল, সে মাঠে বাংলাদেশে সব মঠ-মিশনের সাধুরা সমবেত হয়েছেন সনাতনীদের অধিকার ও দাবি আদায়ে। সনাতনীদের ওপর যত নিপীড়ন হবে আমরা তত বেশি ঐক্যবদ্ধ হব। আমাদের এই ঐক্যকে কোনভাবেই বিভক্ত করতে পারবেন না। এই ঐক্য বাংলার। এটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বির্নিমানের ঐক্য।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে যত গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, যারা আত্ম বিসর্জন দিয়েছেন তাদের স্মরণে এই ঐক্য। আজ সকালে প্রর্বতক মন্দিরে সাধুরা মিলে বৈঠক করেছি। একটি সমন্বয়ক পরিষদ গঠন হয়েছে। এতদিন আমাদের অভিভাবক ছিল না। এখন পরিষদ হয়েছে। ভয়ের কোনো কারণ নেই। সনাতনীরা সর্বদা সাহসী। যারা ভীতু তারা এ বঙ্গের পুত্র হতে পারে না। এ বঙ্গের উত্তরাধিকার আমরা।
এসময় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সনাতনীদের উৎখাতের চেষ্টা করবেন না। কেউ আমাদের উৎখাত করে শান্তিতে থাকতে চাইলে এ ভূমি আফগানিস্তান হবে, সিরিয়া হবে। সাম্প্রদায়িক আচরণ করে বাংলাদেশের কোনো গণতান্ত্রিক শক্তি রাজনীতি করার সুযোগ পাবে না। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হচ্ছে বারবার, এদেশে স্থিতিশীলতা আসছে না। কারণ সহনশীলতা লুপ্ত হচ্ছে। সম্মানবোধ হারিয়ে যাচ্ছে, শিক্ষককে পদত্যাগ করানো হচ্ছে।
শুধুমাত্র সংখ্যালঘু পরিচয়ে ৯৩ জনকে পুলিশের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভেটেরিনারি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দুদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। মাঝখানে কিছুদিন এমন অপকর্ম থেমে গিয়েছিল এখন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এসব কাজ বাংলাদেশের সংস্কৃতির পরিপন্থি। আমরা আর নীরব থাকব না, মাঠে নেমেছি, বলেন তিনি।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী বলেন, কেউ যদি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনায় জড়িত থাকে তাদের আসামি করুন, বিরোধীতা করব না। কিন্তু বেছে বেছে মামলায় আসামি করা হচ্ছে, এসব বন্ধ না করলে সহনশীলতা নষ্ট হবে। সনাতনীদের বাদ দিয়ে কোনো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচেষ্টা কখনো করবেন না। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ৪টি মূলনীতিতে। আমাদের দলীয় পরিচয়ে নমিনেশন দেওয়া হয়। হিন্দুদের অস্তিত্বের কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। আমরা গণতন্ত্রের নামে প্রহসনকে মেনে নেব না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমরা সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন চাইছি, সংখ্যালঘু কমিশন চাইছি, মন্ত্রণালয় চাইছি। সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে-আমাদের আপত্তি নাই। কিন্তু দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে সংবিধান সংশোধন মানব না। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হিন্দু হয়েছে। আর এদেশে একজন করে ঝেঁটিয়ে বিদায় করছেন। জেএমসেন হলে মামলায় আসামিদের জামিন হয়ে গেল। আমাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানলেও জামিন পায়। আর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়।
মহাসমাবেশে লালো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি বলেন, বহুদিন উপেক্ষিত হয়েছি, আমরা ত্যাগী সাধুরা এ আন্দোলনের মুখ হবে এবং নেতৃত্ব দেবে। এ আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। এ আন্দোলনকে হারিয়ে যেতে দিবো না। রংপুরে, খুলনা, বরিশালে মহাসমাবেশ হবে। প্রতিটি জেলায় সমাবেশ, উপজেলায় সমাবেশ হবে। সুশৃঙ্খল আন্দোলন এটি, রাজনৈতিক আন্দোলন না।
আন্দোলনকে রাজনৈতিক রঙ চড়িয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে উল্লেখ করে ব্রহ্মচারী বলেন, একটি তথাকথিত পোর্টাল ইসকনের সমাবেশে ছাত্রলীগ যোগ দিচ্ছে বলে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। অথচ এ নিয়ে সরকারের কোনো এজেন্সি প্রতিবাদটাও করেনি। আমাদের সমাবেশকে রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ ছাত্রলীগ, যুবলীগ হয়েছে, কেউ আজকে জামায়াত, বিএনপি ও সমন্বয়ক পদ দিয়ে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে, এতে কিন্তু আপনাদের দোষ নাই, শুধুমাত্র হিন্দুদের দোষ। এ প্রবণতা পরিহার করুন।
এদেশের জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ রয়েছি এখনো, নিঃশেষিত হইনি। আমরা পিছিয়ে যাব না, হারিয়ে যাব না। এ ভূমিকে আগলে রাখব। দেশমাতৃকাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দিব না। আমাদের আন্দোলনকে অন্যরূপ দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, এখানে কেউ নেতা নয়। সুতরাং, মাতৃভূমি রক্ষার জন্য সর্বাবস্থায় সচেতন থাকব। এলাকায় এলাকায় এক একটা যুব গোষ্ঠী গড়ে তুলুন। আমাদের দেবালয় আমরা পাহারা দিব, অন্য কারো এসে পাহারা দিতে হবে না।
সমাবেশে যোগ দেওয়া কৈবল্যধাম আশ্রমের মহারাজ কালীপদ ভট্টাচার্য্য বলেন, সনাতনী সমাবেশ যাতে উজ্জীবিত হয় এজন্য ঐক্যবদ্ধ হোন। সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন ৮ দফা দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে। মৃত্যু হবেই, ভয় নেই। মৃত্যুকে ভয় করলে চলবে না। এই মাতৃভূমিতে আমরা উড়ে এসে জুড়ে বসিনি। আমরা এই মাটিরই সন্তান।
গোপীনাথ দাস ব্রহ্মচারী বলেন, যে নতুন বাংলাদেশ গঠন করা হলো সেখানে প্রশাসনের ব্যবস্থা থাকার পরও কেন ষষ্ঠী পূজার দিন প্রতিমা ভাঙা হলো? বিসর্জনে কেন ঢিল ছোঁড়া হলো। এসবের জবাব দিতে হবে। সনাতনীরা বাঙলাতে জন্মেছে, এখান থেকে বিতাড়িত করার দুঃসাহস কারও নেই। সনাতনী ধর্ম সম্পর্কে কেউ যদি বিদ্রুপ করে তাহলে কোনো সনাতনী বসে থাকবে না। আমরা কোনো রাজনৈতিক নেতার পা ধরে বাঁচি না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ভক্ত-অনুসারীদের ধর্মান্তরিত করার জন্য একটি চক্র উঠে পড়ে লেগেছে। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। নিজেদের ধর্ম রক্ষার জন্য সকলকে সচেতন থাকতে হবে। দাবি না রাজপথে থাকব। দাবি আদায় না হলে নবজাতক নিয়েও রাজপথে নামব।
