❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নে প্রবহমান ধাইজান নদীকে সরকারি নথিপত্রে ‘খাল’ দেখিয়ে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পের আওতায় ৩৯ লাখ টাকায় দেড় কিলোমিটার অংশে খননকাজ চলছে।
৫ বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃখনন হওয়া নদীটির শ্রেণি পরিবর্তন, খণ্ডিত খনন এবং কাজের পদ্ধতি নিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে।
এমন কর্মকাণ্ডের ফলে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ নয়-ছয়ের অভিযোগ উঠেছে ইতিমধ্যে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আইনি নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো প্রবহমান নদীকে খালে রূপান্তর বা তার শ্রেণি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পে ধাইজান নদীটিকে খাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জলঢাকা উপজেলার দড়িভিজা বিলাঞ্চল থেকে উৎপন্ন ধাইজান একটি প্রবহমান নদী, যার গড় প্রস্থ ৫০ মিটার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নদীটির ২৯ কিলোমিটার এলাকায় পুনঃখনন করা হয়েছিল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে ইজিপিপি প্রকল্পের আওতায় কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের অভ্যন্তরে ধাইজান নদীর মাত্র দেড় কিলোমিটার অংশে খননকাজ চলছে। পুরো নদী বাদ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট অংশে এভাবে খণ্ডিত খননের যৌক্তিকতা ও সুফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্প কমিটির সভাপতি এবং পুটিমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা যে অংশ থেকে শুরু করছি, সেখানে ১৫০০ মিটার খাল খনন হচ্ছে। কিন্তু এই ১৫০০ মিটারের পেছনে আরও প্রায় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটারের মতো অংশ বাকি রয়ে গেছে। এই পেছনের অংশটা না কাটলে পানি নিষ্কাশন পুরোপুরি স্বচ্ছ হবে না।
আপাতত এই দেড় কিলোমিটারের পানি ভালোভাবে কাটলেও পেছনের অংশটা যদি ত্রাণ মন্ত্রণালয় বা প্রশাসন নজর দিয়ে বর্ধিত করার ব্যবস্থা করত, তবেই এলাকার লোকজন এর পুরোপুরি সুফল পেত, বলেন তিনি।
মো. জাহিদুল ইসলাম দাবি করেন, এখন যে খনন হচ্ছে, তাতে কেবল এই অঞ্চলের উপকার হবে। কিন্তু পেছনের পানিটা যখন আটকে যাবে, তখন আবারও সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও অনিয়মের অভিযোগ
নদীর এই খণ্ডিত খনন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। তাদের ভাষ্যমতে, পুরো নদী বাদ দিয়ে অল্প কিছু জায়গা খনন করায় তা চাষাবাদ বা এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো কাজে আসবে না। উল্টো মাঝখানে গর্ত করায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
ধাইজান নদী তীরের বাসিন্দা মোসাদ্দেক হোসেন, মানিক মিয়াসহ অন্তত ২০ জন বলেন, পুরনো প্রবহমান এই নদীটি ৫ বছর আগে শেখ হাসিনার সরকার ৮ কোটি টাকা খরচ করে খনন করেছিল। এখন আবার পুরো নদী বাদ দিয়ে শুধু মাঝখানের দেড় কিলোমিটার অংশে খননকাজ করা হচ্ছে। এভাবে টুকরো টুকরো করে কাটলে নদীর স্বাভাবিক পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে এবং বর্ষায় নদীভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হবে।
তারা জানান, শেখ হাসিনা সরকার নদীটা ভালোভাবে খনন করেছিল, নদীর নাব্য ঠিকই আছে। তবুও অহেতুক খাল খনন দেখিয়ে রাষ্ট্রের অর্থ লুটপাটের আয়োজন চলছে।
প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অতিদরিদ্র শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানোর কথা থাকলেও এখানে নদীর পুরো তলদেশ ভেকু (এক্সকাভেটর) যন্ত্র দিয়ে কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খননকাজে নিয়োজিত স্থানীয় শ্রমিক ও এলাকার বাসিন্দারা জানান, পুরো তলদেশ যন্ত্র দিয়ে কাটার ফলে কাজ শেষ না হতেই নদীটির বিভিন্ন অংশের পাড় ধসে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এ বিষয়ে সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান জানান, “আমাদের নথিতে ধাইজান একটি প্রবহমান নদী এবং ৫ বছর আগে এটি খনন করা হয়েছিল। ফলে এটিকে খাল দাবি করার কোনো সুযোগ নেই।”
তবে পাউবো ধাইজানকে নদী বললেও, এটিকে বড় নদী মানতে নারাজ নীলফামারী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মনোয়ারুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, ছোট নদীগুলো ইজিপিপির আওতায় এনে খনন করা যেতে পারে।
উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব থাকলেও কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমান জানান, তার এই কর্মস্থলে যোগদানের আগেই এই প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
