মতামত || ৫ আগস্ট ও শেখ হাসিনার ‘তৃতীয় পথ’: একটি কৌশলগত ও মানবিক মূল্যায়ন

মতামত || ৫ আগস্ট ও শেখ হাসিনার ‘তৃতীয় পথ’: একটি কৌশলগত ও মানবিক মূল্যায়ন
শেয়ার করুন

আফফান উর রহমান হাবীব, নিউইয়র্ক


৫ই আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যাহ্নে বাংলাদেশের রাজনীতি যে চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, আপাতদৃষ্টিতে সেখানে পথ ছিল মাত্র দুটি। প্রথমটি ছিল—ক্ষমতার কেন্দ্রে অটল থেকে প্রতিপক্ষ ও বিভ্রান্ত মবের মুখোমুখি হওয়া, যার অনিবার্য পরিণতি হতো এক ভয়াবহ রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ। দ্বিতীয়টি ছিল—চরম আত্মসমর্পণ।

ক্ষমতার সমীকরণ এবং জেদের বশে প্রথম পথটি বেছে নিলে পক্ষ-বিপক্ষের হাজারো মানুষের প্রাণ যেত, যাদের প্রত্যেকেই দিনশেষে এই দেশেরই সন্তান। এক চরম ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ সংকটে পড়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কিন্তু সেই অবরুদ্ধ মুহূর্তেও যে একটি তৃতীয় পথ খোলা ছিল, তা হয়তো তৎকালীন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবনারও বাইরে ছিল। শেখ হাসিনা সেই তৃতীয় পথটিই বেছে নিলেন—তিনি যুদ্ধও করলেন না, আবার আদর্শিক আত্মসমর্পণও করলেন না। তিনি বেছে নিলেন ‘কৌশলগত পিছুহটা’ (Strategic Retreat)।

নিজের অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি সময় দিলেন রাষ্ট্রকে, সময় দিলেন এই জাতিকে—যাতে আবেগের জোয়ার কেটে যাওয়ার পর মানুষ নিজেই নিজের ভুলের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে।

তাঁর এই সরে যাওয়াকে প্রতিপক্ষরা ‘পলায়ন’ বলে উপহাস করতে পছন্দ করে। কিন্তু এই উপহাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে তাদের এক গভীর ক্ষোভ ও হতাশা। তারা ভালো করেই জানতো, শেখ হাসিনা গণভবনে অবস্থান করলে পেশাদার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়তো।

অন্যদিকে, আড়ালে থাকা উগ্র ও স্বার্থান্বেষী মহলটিও রক্তগঙ্গা বইয়ে দিতে দ্বিধা করতো না। বিনা রক্তপাতে, অত্যন্ত চতুরতার সাথে শেখ হাসিনা নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়ায় সেই উগ্রপন্থীদের বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটানোর ছক ভেস্তে যায়। আর সেই ক্ষোভ ও রক্তপিপাসা তারা পরবর্তীতে দেখালো পুরো দেশের ওপর।

সরকারের বিদায়ের পরপরই দেশজুড়ে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তার সুযোগ নিয়ে একদল উগ্রপন্থী ও স্বার্থান্বেষী মহল মেতে উঠলো ধ্বংসযজ্ঞে। থানা পুড়িয়ে, ভাঙচুর চালিয়ে, বাড়িঘরে আগুন দিয়ে এবং নির্বিচারে মানুষ কুপিয়ে ও পুড়িয়ে তারা এক উৎসবের আবহ তৈরি করতে চাইল। কিন্তু এই চরম বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার মধ্য দিয়েই মূলত তাদের হিংস্র মুখোশটি জাতির সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষ আজ বুঝতে পারছে, একটি মহৎ আবেগকে পুঁজি করে কেমন এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এই দেশকে।

ইতিহাস আবেগ দিয়ে নয়, বরং নির্মম সত্য ও ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়। আজ যে পরিস্থিতিকে পরাজয় বলে উদযাপন করা হচ্ছে, সময় হয়তো তাকেই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নেওয়া একটি অন্যতম দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।

শেখ হাসিনা তাঁর পুরো জীবন এই জাতির সুরক্ষায় উৎসর্গ করেছেন। ৫ আগস্টের সেই কঠিন মুহূর্তে নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে দেশের মানুষের জীবনের মূল্যকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি আরও একবার প্রমাণ করেছেন—তিনি এই দেশের মানুষের এক অলিখিত রক্ষাকবচ।

সাময়িক এই মেঘ কেটে যাবে, খুব দ্রুতই এই গভীর ষড়যন্ত্রের কুয়াশা ভেদ করে সত্যের বিজয় ঘটবে।

Visited 120 times, 1 visit(s) today