❐ চট্টগ্রাম ব্যুরো
হাজার বছরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে নানা অভিধায় ভূষিত করা হয়ে থাকে। কেউ বলেন ‘তিলোত্তমা নগরী’, কেউ ডাকেন ‘প্রাচ্যের রাণী’। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় অনেকে এটিকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবেও অভিহিত করেন। বছরের পর বছর ধরে শোনা গেছে সিঙ্গাপুর সিটি বা সাংহাইয়ের আদলে এই নগরীকে সাজানোর প্রতিশ্রুতি। সর্বশেষ শোনা যাচ্ছে চট্টগ্রামকে স্মার্ট সিটিতে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নগরীকে নতুনভাবে সাজানোর আগ্রহ যতটুকু দেখা যায়, এই নান্দনিক শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ ঠিক ততটাই কম। নগরবাসীর অভিযোগ, এ বিষয়ে কেউ গরজও বোধ করেন না।
বিশেষ করে ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের পর থেকে সৌন্দর্যমণ্ডিত শহরটি পরিণত হয়েছে বীভৎস ভাগাড়ে। যেখানে আগে গভীর রাতেও শহরে নিরাপদে চলাচল করতে পারতেন সাধারণ মানুষ, সেখানে এখন এমন চিন্তাও কেউ করতে পারেন না। সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিএনপি সরকারের সময় খোদ বিএনপি নেতার পুত্র, জাতীয় দলের ক্রিকেটারও লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
চুরি, ছিনতাই, মাদকসেবীদের উৎপাত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পরিচ্ছন্নতার অভাব শহরটিকে পরিণত করেছে আঁস্তাকুড়ে।
চট্টগ্রাম নগরীর লাইফ-লাইন হিসেবে পরিচিত এশিয়ান হাইওয়ে— অর্থাৎ বহদ্দারহাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কের সিডিএ এভিনিউ অংশের বর্তমান অবস্থা দেখলে এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই সড়কের বিভাজকগুলো— যা আইল্যান্ড নামে পরিচিত— সেগুলো থেকে একে একে খুলে নেওয়া হয়েছে গ্রিল। কে বা কারা এই গ্রিল খুলে নিয়ে গেছে তা অজানা নয়, তবু কোনো সংস্থা এটি প্রতিরোধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সংবাদপত্রে এ বিষয়ে একাধিকবার লেখালেখির পরও নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়নি।
গ্রিলশূন্য এই আইল্যান্ডগুলো এখন নানা ধরনের অপরাধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, সড়কের আইল্যান্ডে রীতিমতো সংসার পেতেছেন কেউ কেউ। কাপড় ও মশারি টাঙিয়ে আড়াল তৈরি করে রাতের অন্ধকারে এমনকি দিনের আলোতেও সেখানে চলছে অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যক্রম। একই সঙ্গে চলছে মাদক সেবন।
সন্ধ্যা নামলেই এলাকায় নেমে আসে আতঙ্ক। সড়ক বিভাজকে ওঁৎ পেতে থাকা মাদকসেবীরা যেকোনো মুহূর্তে পথচারীদের উপর ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালাতে পারে— এই ভয়ে রাতের চলাচল সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো যেন সম্পূর্ণ নির্বিকার। নগরবাসী ক্ষোভের সঙ্গে বলছেন, নতুন করে সৌন্দর্যবর্ধনের প্রয়োজন নেই— শুধু প্রাকৃতিকভাবে যে সৌন্দর্য আছে সেটুকু ধরে রেখে নগরীকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হলেই চট্টগ্রাম তার হৃত সৌন্দর্য ফিরে পাবে। কিন্তু সেই ন্যূনতম দায়িত্বটুকু পালনেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এখন নগরবাসীর কাছে চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
