নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজার, ৬ মে ২০২৬: ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে চকরিয়া উপজেলার মালুমঘাটের হাসিনাপাড়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে একটি পিকআপ ভ্যান চাপায় একই পরিবারের ছয় ভাই নিহত হন। প্রথমে যা ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ বলে মনে হয়েছিল, তদন্তে তা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হয়। আদালত চালককে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে এ ঘটনার আইনি স্বীকৃতি দেন।
নিহত ছয় ভাই হলেন—অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫), রক্তিম সুশীল (৩২), চম্পক সুশীল (৩০) ও স্মরণ সুশীল (২৯)। তাঁরা সুরেশ চন্দ্র সুশীল ও মৃণালিনী সুশীলের সন্তান। ঘটনার কয়েকদিন আগে বাবা সুরেশ চন্দ্র সুশীল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান শেষে মন্দির থেকে ফেরার পথে ভোরের অন্ধকারে এই ঘটনা ঘটে।
বেঁচে যাওয়া বোন মুন্নি সুশীল সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, “আমার ছয় ভাই ও এক বোন রাস্তা থেকে দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ও আরেক ভাই রাস্তায় ছিলাম। পিকআপটি প্রথমে আমাদের না চাপিয়ে ভাইদের চাপা দেয়। তারপর পেছন দিকে ঘুরে এসে আহতদের আবার চাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।” তিনি এটিকে স্পষ্টতই পরিকল্পিত হত্যা বলে অভিহিত করেন।
পটভূমি ও উদ্দেশ্য
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার কয়েকদিন আগে (২৯ জানুয়ারি) ৪০-৫০ জন দুর্বৃত্ত তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে বাবাকে হত্যার হুমকি দেয়। পরদিন বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। হামলার কারণ হিসেবে পরিবার উল্লেখ করে যে, তারা এলাকায় ছোট একটি মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিদেশ থেকে আসা ভাই দীপক সুশীল ইট-বালু এনে মন্দিরের কাজ শুরু করেন, যা স্থানীয় কিছু মহল মেনে নিতে পারেনি।
তদন্ত ও আদালতের রায়
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রতিষ্ঠিত করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, চালক সাহিদুল ইসলাম ওরফে সাইফুল (তখন ২২ বছর) প্রথম চাপা দেওয়ার পর গাড়ি পেছনে নিয়ে আহতদের আবার চাপা দেন। তিনি আহতদের উদ্ধারের পরিবর্তে পালিয়ে যান। পিকআপের মালিক মাহমুদুল করিম অনভিজ্ঞ ও লাইসেন্সবিহীন চালককে গাড়ি চালাতে দিয়েছিলেন।
২০২৩ সালের জুন মাসে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল চালক সাহিদুলকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং চালকের বয়স বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মালিক ও তার ছেলের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনে আলাদা বিচার চলছে।
এ ঘটনা দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে পরিকল্পিত হত্যা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের আলোচনা উস্কে দিয়েছিল। নিহতদের মা মৃণালিনী সুশীল রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে আপিলের কথা জানিয়েছিলেন এবং চালকের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিলেন।এই মামলার রায় সড়ক দুর্ঘটনার নামে ইচ্ছাকৃত হত্যার বিরুদ্ধে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে, যা তদন্ত সংস্থা ও আদালতের সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের প্রমাণ দেয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে এখনও পূর্ণ বিচার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
