বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রতিবেদনের সমালোচনা করল সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রতিবেদনের সমালোচনা করল সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্রাসেলস, ৭ মে ২০২৬ — বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইলেকশন অবজার্ভেশন মিশনের (EU EOM) চূড়ান্ত প্রতিবেদনকে গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম (SADF)। গত ২৮ এপ্রিল প্রকাশিত EU EOM-এর প্রতিবেদনে নির্বাচনটিকে “বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত” এবং “গণতান্ত্রিক শাসন পুনরুদ্ধারের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। SADF এই মূল্যায়নকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক মানদণ্ড ও আইনি নজির থেকে মৌলিকভাবে বিচ্যুত।

এসএডিএফ স্বীকার করে যে প্রতিবেদনে কিছু পদ্ধতিগত উন্নতি ও কারিগরি দক্ষতার কথা উল্লেখ রয়েছে, তবে সংগঠনটির মতে এই মূল্যায়ন নির্বাচনের মূলগত ত্রুটিগুলো সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে।

 

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিষয়ে নীরবতা

এসএডিএফ-এর সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো, ইইউ ইওএম তার প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি কোনোভাবেই মূল্যায়ন করেনি। ইউনূস-নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং সম্প্রতি বাংলাদেশের আইনপ্রণেতারা সেই নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, দলটির নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে পদ্ধতিগতভাবে নিপীড়ন করা হয়েছে বলেও এসএডিএফ অভিযোগ করেছে। সংগঠনটি মনে করে, ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের (ইসিএইচআর) সুপ্রতিষ্ঠিত একাধিক নজির অনুযায়ী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষত ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব তুরস্ক বনাম তুরস্ক এবং সোশ্যালিস্ট পার্টি বনাম তুরস্ক মামলায় আদালত স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছে যে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ একটি গণতান্ত্রিক সমাজের কেন্দ্রবিন্দু এবং রাজনৈতিক দলের উপর যেকোনো বিধিনিষেধ অত্যন্ত কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের দাবি রাখে। ইয়াজার বনাম তুরস্ক এবং হাদেপ ও দেমির বনাম তুরস্ক মামলায়ও আদালত জানিয়েছে যে জননিরাপত্তার অজুহাতে বিরোধী শক্তিকে দমন করা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের পরিপন্থী, যদি না তা একান্ত প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রমাণিত হয়। এসএডিএফ আরও উল্লেখ করে যে ইসিএইচআর-এর প্রথম প্রোটোকলের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ, যা জনগণের স্বাধীন মতামত প্রকাশের নিশ্চয়তাদায়ক নির্বাচনের কথা বলে, সেটিও এই প্রক্রিয়ায় লঙ্ঘিত হয়েছে।

 

অন্তর্ভুক্তির সংকীর্ণ ব্যাখ্যা

এসএডিএফ আরও অভিযোগ করেছে যে ইইউ ইওএম “অন্তর্ভুক্তি” ধারণাটিকে অত্যন্ত সংকীর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেছে। প্রতিবেদনে নারীর অংশগ্রহণের ঘাটতি ও নির্বাচনী অর্থায়নের তদারকির দুর্বলতার কথা উল্লেখ থাকলেও, ইউরোপীয় মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকৃত অন্তর্ভুক্তির অর্থ হলো রাজনৈতিক কর্মী ও সুশীল সমাজ ভয়ভীতি ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু, সাংবাদিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার, দীর্ঘমেয়াদি বিচারপূর্ব আটক এবং জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের এই চিত্র ইইউ-এর নিজস্ব মানবাধিকার কৌশল ও কাউন্সিল সিদ্ধান্তের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ নয় বলে এসএডিএফ মনে করে। ওই কাঠামো স্পষ্টভাবে বলে যে গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে বৃহত্তর মানবাধিকার পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

 

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ উপেক্ষা

আন্তর্জাতিক ও বিচারিক হস্তক্ষেপের বিষয়গুলো উপেক্ষা করার জন্যও ইইউ ইওএম-এর কড়া সমালোচনা করেছে এসএডিএফ। জাতিসংঘের স্বেচ্ছাচারী আটক বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইউএন-ডব্লিউজিএডি) তার ১০৩তম অধিবেশনে গৃহীত মতামতে (মতামত নং ৪০/২০২৫) বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহরিয়ার কবিরের গ্রেপ্তার ও আটককে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্বেচ্ছাচারী এবং মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক মতামতের স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত বলে রায় দিয়েছে। একইসঙ্গে, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) চলতি বছরের ২২ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠিয়ে কারাবন্দি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে, যা যথাযথ প্রক্রিয়া লঙ্ঘন ও বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর উদ্বেগ তুলে ধরে। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ইইউ ইওএম-এর প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ অনুল্লিখিত থাকায় এসএডিএফ মনে করে এটি বহুপাক্ষিকতা ও জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রক্রিয়ার প্রতি ইইউ-এর ঘোষিত অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

 

গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি

দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও এসএডিএফ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে যে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে পরিচালিত এবং পদ্ধতিগত দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করা একটি নির্বাচনকে ইইউ অনুমোদন দিলে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করতে পারে। ইসিএইচআর-এর রেফাহ পার্তিসি বনাম তুরস্ক মামলার যুক্তি উদ্ধৃত করে এসএডিএফ বলেছে যে বৈধ রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করলে চরমপন্থী ও সহিংস শক্তি মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পায়। নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে ডানপন্থী ইসলামপন্থী উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমানতা এই আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলেছে বলে সংগঠনটি মনে করে।

 

SADF-এর সুপারিশ

এসএডিএফ এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি একাধিক সুনির্দিষ্ট সুপারিশ রেখেছে। ভবিষ্যতের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মূল্যায়নে রাজনৈতিক দলের উপর নিষেধাজ্ঞা, বিরোধী নেতাদের গণবিচার এবং অংশগ্রহণকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ভয়ের পরিবেশকে স্পষ্টভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। ইইউ-কে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানাতে হবে। একইসঙ্গে আটক সাংবাদিক ও কর্মীদের বিষয়ে ইউএন-ডব্লিউজিএডি-এর মতামত ও বিচারিক যোগাযোগ বাস্তবায়নেও চাপ দিতে হবে। সবশেষে এসএডিএফ জোর দিয়ে বলেছে যে প্রকৃত গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি কেবল সুশৃঙ্খল নির্বাচন পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন সকল রাজনৈতিক শক্তি, সংখ্যালঘু ও সমালোচনামুখর কণ্ঠস্বরের নির্বিঘ্ন অংশগ্রহণ, যা ছাড়া নির্বাচন জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রকাশ না হয়ে বরং বর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

Visited 16 times, 1 visit(s) today