ধানের নতুন দাম নির্ধারণ, হাওরে বোরো চাষিরা হতাশ

ধানের নতুন দাম নির্ধারণ, হাওরে বোরো চাষিরা হতাশ
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


চলতি বোরো মৌসুমে চৈত্রের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জলাবদ্ধতায় হাওরের অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। আর যে ফসল রক্ষা পেয়েছে, তার ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

বর্তমান সরকার ঘোষিত ধান-চালের নতুন ক্রয়মূল্য চাষিদের হতাশ করেছে।

গত বুধবার সরকার ধান কিনতে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা দাম নির্ধারণ করেছে—যা গত বছরের মতোই অপরিবর্তিত। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও একই দাম বহাল থাকায় তারা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। ধানের দাম বাড়ানোর দাবি ছিল কৃষকদের।

জেলার ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় চলতি মৌসুমে যথাক্রমে ১৮ হাজার ২৯০ ও ১৩ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ইতোমধ্যে অন্তত ৬৫৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে টগার হাওরে, যেখানে আবাদকৃত ২ হাজার ৩৪০ হেক্টরের মধ্যে ১৮০ হেক্টরের বেশি জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় ২২.৫২ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এবার হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত বাধের কারণে জলাবদ্ধতায় এবার বেসরকারি হিসেবে অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।

এখন সরকারের নতুন দাম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক স্থানে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না, পাশাপাশি শ্রমিক সংকটও কাটেনি। ফলে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষেতের ধান কাটতে শ্রমিক পাচ্ছেন না কৃষকরা।

হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জানান, হাওরাঞ্চলের অর্থনীতি মূলত বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতিবছরই বাঁধ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শ্রমিক সংকট এবং বাজারের অস্থিরতার কারণে প্রান্তিক কৃষকরা ঝুঁকির মুখে পড়েন। এবারের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে।

কৃষকরা জানান, ভেজা ধান সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় এবং শ্রমিক মজুরি ও ঋণের চাপ মেটাতে বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। হাওর থেকে উপজেলা সদরে পরিবহনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই মাঠেই প্রতি মণ ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন, যেখানে সরকারি দরে এক হাজার ৪০০ টাকার বেশি পাওয়ার কথা।

এদিকে বৈশাখের শুরু থেকেই ফড়িয়ারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের মাধ্যমে চাতাল মালিক ও ব্যবসায়ীরা ধান কিনে নিচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে ধানের দাম আরও কমে যাচ্ছে।

ধর্মপাশার কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, ফসলের ক্ষতি হয়েছে, অথচ বাজারে দাম বাড়েনি। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকের নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। ধানের দাম আরো বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন কৃষকরা।

আরেক কৃষক গোলাম হুসাইন জানান, প্রতি বিঘায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হলেও ধান বিক্রি করে পাওয়া যায় মাত্র ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। ফলে লাভ খুবই সীমিত। বর্গাচাষিদের ক্ষেত্রে লোকসানই গুনতে হচ্ছে বলে জানান আরেক কৃষক সারোয়ার হোসেন।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ধান চাষে লাভবান হতে পারছেন না। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় সরাসরি কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভবান হবে।

Visited 14 times, 1 visit(s) today