❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের সরাসরি অভিঘাতে আকাশপথে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় চাপ গিয়ে পড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের ওপর। ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক বিঘ্ন, যা ইতোমধ্যে শ্রমবাজার, প্রবাসী আয় প্রবাহ ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্র অনুযায়ী, গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭শে মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যগামী ও সেখান থেকে আসা মোট ৭৯৭টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৪০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় হাজারো যাত্রী নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি।
সর্বশেষ গত শুক্রবারও নতুন করে ২২টি ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংঘাতের কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এসব রুটে চলাচলকারী প্রায় সব বাণিজ্যিক ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে এয়ারলাইনগুলো।
বাতিল হওয়া অতিসাম্প্রতিক ফ্লাইটগুলোর মধ্যে কুয়েতগামী চারটি, শারজাহগামী এয়ার অ্যারাবিয়ার ছয়টি, বাহরাইনগামী গালফ এয়ারের দুটি, দোহাগামী কাতার এয়ারওয়েজের চারটি, দুবাইগামী এমিরেটসের দুটি এবং কুয়েতগামী জাজিরা এয়ারওয়েজের চারটি ফ্লাইট রয়েছে।
ফ্লাইট বাতিলের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যআয়ের প্রবাসী শ্রমিকরা।
বরগুনার মিজানুর রহমান সৌদি আরবে কর্মস্থলে ফেরার জন্য নির্ধারিত ফ্লাইটে যাত্রা করতে এসে বাতিলের মুখে পড়েন। ভিসার মেয়াদ সীমিত থাকায় নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানান তিনি।
একইভাবে বিভিন্ন গন্তব্যে কর্মরত বহু শ্রমিক নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নিয়োগকর্তার চাপের মুখে পড়েছেন।
বিমানবন্দরে সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক যাত্রী পরিবার-পরিজন নিয়ে বিদায় জানাতে এসে শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা এসব যাত্রীদের জন্য তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত আর্থিক ও মানসিক চাপ।
অনেকে একাধিকবার টিকিট পুনঃনির্ধারণ করতে গিয়ে বাড়তি অর্থ ব্যয় করছেন, আবার কেউ কেউ বিকল্প পথে যাত্রা করতে গিয়ে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া গুনছেন।
এদিকে, যাত্রীদের একটি অংশকে বিমানবন্দর এলাকায় বা আশপাশে অবস্থান করতে হচ্ছে। সীমিত পরিসরে খাবার ও অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করা হলেও অধিকাংশ যাত্রীকে নিজ খরচে আবাসিক হোটেলে থাকতে হচ্ছে। এতে করে নিম্নআয়ের শ্রমিকদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু যাত্রী ভোগান্তিই নয়, দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে অনেক শ্রমিক চাকরি হারাতে পারেন, যার প্রভাব পড়বে প্রবাসী আয় প্রবাহে।
পাশাপাশি নতুন কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প রুট ব্যবস্থাপনা, দ্রুত ফ্লাইট পুনঃনির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য সমন্বিত সহায়তা নিশ্চিত না হলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
