মশাদের দখলে চট্টগ্রাম শহর, কাজ হচ্ছে না কোনো ওষুধেই

মশাদের দখলে চট্টগ্রাম শহর, কাজ হচ্ছে না কোনো ওষুধেই
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


চট্টগ্রাম মহানগরের হামজারবাগে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা শাহরিয়ার কামাল। স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় দিনের বেশির ভাগ সময় তাদের কাটে বাইরে। সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলেও স্বস্তি মিলছে না তাদের। কারণ, ছোট্ট এক যন্ত্রণার নাম—মশা।

দরজা-জানালা বন্ধ রেখে কিংবা অ্যারোসল ব্যবহার করেও মশার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না তারা।

বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ শাহরিয়ার বলেন, শীতকালে দরজা-জানালা বন্ধ রাখায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও এখন গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বাতাসের জন্য জানালা খুলতে হবে, কিন্তু তখন মশার উপদ্রব কীভাবে সামলাবেন—তা নিয়ে এখন থেকেই দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

শুধু হামজারবাগ নয়, একই চিত্র চট্টগ্রাম নগরের প্রায় সর্বত্র। আবাসিক এলাকা, অফিসপাড়া, সড়ক, অলিগলির দোকান থেকে শুরু করে বিপণিবিতান—সবখানেই মশার উৎপাত বেড়েছে। পুরো চট্টগ্রাম দখল করে নিয়েছে মশারা।

নগরবাসীর অভিযোগ, এমন সময়ে মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয়।

তবে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, মশা নিধনে কোনো ধরনের গাফিলতি নেই। নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হচ্ছে এবং নতুন করে ৩০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে গত ১৪ই মার্চ থেকে বিশেষ অভিযানও শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে সাধারণত তিন ধরনের মশা বেশি দেখা যায়—কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্সের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। এডিস মশা ডেঙ্গু এবং অ্যানোফিলিস ম্যালেরিয়ার বাহক হলেও বছরের এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৩ জন এবং মারা গেছেন একজন।

সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, মশা দমনে অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড—দুই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। ডেল্টামেথ্রিন বর্তমানে অ্যাডাল্টিসাইড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, আর ভবিষ্যতে ম্যালাথিয়ন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গত বছরের ডিসেম্বর থেকে বিটিআই নামের আধুনিক লার্ভিসাইড ব্যবহার শুরু হয়েছে, যা মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর।

তবে প্রশ্ন উঠছে—এত উদ্যোগের পরও কেন কমছে না মশার উপদ্রব?

এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন একই ওষুধ ব্যবহারের ফলে মশা প্রতিরোধক্ষম হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধ তিন থেকে চার বছর ধরে প্রয়োগ করা হচ্ছে, ফলে এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে ওষুধ পরীক্ষা করে প্রয়োজনে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বড় একটি ঘাটতি হলো হালনাগাদ জরিপের অভাব। কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি, তা নির্ধারণে নতুন কোনো জরিপ হয়নি। পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে নিধন কার্যক্রম।

যদিও বিভিন্ন গবেষণায় নগরের কিছু হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য সিটি কর্পোরেশনের হাতে নেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দলের আগের গবেষণায়ও দেখা গেছে, দীর্ঘদিন একই কীটনাশক ব্যবহারে মশার মধ্যে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

গবেষকরা রাসায়নিকের পাশাপাশি বিকল্প পদ্ধতি—যেমন হারবাল উপাদান ব্যবহার এবং নালা-নর্দমা ও জলাশয় পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। কিন্তু এসব সুপারিশের বেশির ভাগ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, নগরের অনেক স্থানে দাঁড়ালেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা আক্রমণ করছে। কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Visited 15 times, 1 visit(s) today