- স্বাস্থ্যখাতে বিপর্যয়: ইপিআই টিকা সংকটে লাখো শিশু ঝুঁকিতে
- আওয়ামী লীগের প্রকল্প বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে ৫ম সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ
- অর্থ বরাদ্দ–কেনাকাটার জটিলতায় যক্ষ্মা-হাম-রুবেলা-পোলিওসহ গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুদ শূন্যের কোটায়
❐ বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশে অর্থ বরাদ্দ ও কেনাকাটার জটিলতার কারণে যক্ষ্মা, হাম-রুবেলা (এমএমআর), পোলিও ও নিউমোনিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইপিআই টিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে বিভিন্ন জেলার মজুদ ফুরিয়ে আসায় লাখ লাখ শিশুর টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার বাস্তব আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী শিশুর ৯ মাস বয়সে এমএমআর এর প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও অর্থ ছাড়ে ধীরগতির কারণে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ৫ম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (HPNSP) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেয়। এই কর্মসূচির আওতাতেই এত বছর ধরে ইপিআই টিকা কেনা ও সরবরাহ নির্বিঘ্নভাবে চলত।
সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ থাকায় ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ইপিআই টিকা কেনা হয়নি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ২০২৫ সালে, যখন দেশের মজুদ দ্রুত শেষ হতে শুরু করে।
একজন জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, প্রকল্প বন্ধ করে দিয়ে নতুন বিকল্পও তৈরি করা হয়নি। ফলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার ইউনূস আমলে টিকা কেনার দায় পুরোপুরি সরকারের ওপর পড়ে, কিন্তু তারা প্রস্তুতই ছিল না।
এক বছরেই টিকার জন্য হাহাকার সারাদেশে: টাকা দিয়েও মিলছে না বিনামূল্যের টিকা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, ড. ইউনূসের ইচ্ছে ছিল বিনামূল্যের টিকা খাত পুরোপুরি এনজিওর হাতে তুলে দেওয়া। এতে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে কোটি কোটি শিশু যে ৬টি প্রাণহানিকর রোগের টিকা পেত মাত্র ১০ টাকায়, সেই সুবিধা বন্ধ হয়ে যেত। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব টিকার প্রতিটির মূল্য কয়েক হাজার টাকা। বাংলাদেশ সরকার এসব টিকা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থার মাধ্যমে পেত সহায়তার মাধ্যমে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনজিওর হাতে যদি ইপিআই প্রকল্প চলে যেত এবং এসব টিকা যদি বেশি দামে কিনতে হতো, তবে টিকাদানের হারের যে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছিল বাংলাদেশ, তাতে রাতারাতি ধস নামত। দরিদ্র-হতদরিদ্র তো বটেই, মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যেত টিকার মূল্য। যদিও লাভবান হতো ড. ইউনূসের বেনামি প্রতিষ্ঠানগুলো। মূলত তারাই নিয়ন্ত্রণ করত ইপিআই খাতটি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রাজশাহী, গাইবান্ধা, কুমিল্লা, নরসিংদীসহ অন্তত দশটি জেলায় গত এক মাসের বেশি সময় ধরে একেক টিকার সংকট চলছে। সিভিল সার্জন অফিসগুলো জানিয়েছে, কেন্দ্রে সরবরাহ না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে কিছু টিকাদান সেশন বাতিল করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত বছর থেকেই টিকা কিনতে হচ্ছে, এতদিন ছিল বিনামূল্যে। এটিও বাংলাদেশের জন্য আরেক ধরনের নতুন সংকট। এতদিন দাতাদের সহযোগিতায় ইপিআই টিকার মূল ব্যয় বহন করা হতো। কিন্তু দাতা সংস্থার চুক্তিগুলো বহাল রাখার বদলে অন্তর্বর্তী সরকার তা কার্যত স্থগিত করে। ফলে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থে টিকা কিনতে হচ্ছে—যার প্রস্তুতি সরকার নিতে পারেনি।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, আওয়ামী লীগের আমলে চালু করা উন্নয়ন প্রকল্পকে বাতিল করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখন জনস্বাস্থ্যে বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
একজন সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, যারা ভাবছিল প্রকল্প না থাকলে শুধু কাগজপত্র বন্ধ হবে, তারা ভুল করেছে। বাস্তবে লাখো শিশুর টিকাদান থমকে গেছে। এটা সরাসরি জনস্বাস্থ্যঝুঁকি।
স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে সম্পৃক্তরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে চালু থাকা জনহিতকর প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের মতে, সিদ্ধান্তটি ছিল ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’, যার ফলে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে দেশজুড়ে টিকা-সংকট তৈরি হয়েছে।
যক্ষ্মা, হাম-রুবেলা, পোলিও—এসব টিকা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে রোগ প্রতিরোধ জোরদার করে। এসব টিকা বন্ধ বা বিলম্বিত হলে শিশুদের মধ্যে রোগ বিস্তার এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়বে।

