নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া আসামিপক্ষের জেরার মুখে পড়ে গুম-খুনের ‘প্রতিরোধ’ নিয়ে এক অদ্ভুত কাহিনি উপস্থাপন করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, সেনাপ্রধান থাকাকালীন গুমের ‘সংস্কৃতি’ প্রতিরোধে তিনি ‘অসংখ্য পদক্ষেপ’ নিয়েছেন—কিন্তু এসবের কোনো দালিলিক প্রমাণ, লিখিত চিঠি বা রেকর্ড নেই।
জেরায় আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনির প্রশ্নের জবাবে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, “গুমের সংস্কৃতি প্রতিরোধ করতে আমি অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।” তবে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি স্বীকার করেন যে, এ মর্মে প্রধানমন্ত্রী বা সুপার চিফ বরাবর কোনো চিঠি পাঠাননি, লিখিতভাবে কাউকে জানাননি। কোনো দালিলিক প্রমাণও উপস্থাপন করতে পারেননি।
এক পর্যায়ে তিনি এক কনিষ্ঠ অফিসারের (র্যাব থেকে প্রত্যাবর্তিত) সাথে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেন। অফিসারটি নাকি তার সামনে দুজনকে হত্যা করার কথা ‘স্বীকার’ করেছিলেন। কিন্তু অফিসারের নাম, সাক্ষাতের তারিখ, কোনো সাক্ষী বা আলামত—কিছুই স্মরণ নেই।
তিনি বলেন, “তার নাম স্মরণ নেই। কত তারিখ তিনি আমার কাছে এসেছিলেন, স্মরণ নেই।” এমনকি অফিসারের ‘স্বীকারোক্তি’ রেকর্ডও করা হয়নি।
আরও চাঞ্চল্যকর দাবি—অফিসারটি প্রতিটি হত্যার জন্য ১০ হাজার টাকা মসজিদে দান করেছেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে এ কারণে তাকে ‘নিষ্কৃতি’ দেওয়া হয়নি বলে ইকবাল করিম জানান। কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কারণ কোনো প্রমাণ বা সাক্ষী ছিল না।
জেরার এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে, সেনাপ্রধান থাকাকালীন কতজন গুম হয়েছিলেন, তা বলতে পারবেন না। গুম হওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধারের কোনো চেষ্টাও করেননি। তবে ‘গুম হচ্ছে’ মর্মে তাকে জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার এক পর্যায়ে মন্তব্য করেন, “আপনি উত্তরপাড়ার বিশেষজ্ঞ, আমরা দক্ষিণপাড়ার বিশেষজ্ঞ।” এই মন্তব্য জেরার প্রেক্ষাপটে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ২০১০-২০১৩ সালের মধ্যে শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগ রয়েছে। ইকবাল করিম ভূঁইয়া প্রথম সাক্ষী হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে জবানবন্দি দেন এবং এখন চতুর্থ দিনের জেরা চলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাবেক সেনাপ্রধানের এসব দাবি ও স্মৃতিভ্রংশের মিশ্রণ গুম-খুনের মতো গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আরও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কোনো লিখিত প্রমাণ বা রেকর্ড ছাড়া ‘অসংখ্য পদক্ষেপ’ ও ‘লোকমুখে শোনা’ স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে গুম প্রতিরোধের দাবি অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
