বিশ্লেষণ || ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন এবং ’হ্যাঁ/না’ ভোট বিষয়ক কিছু কথা

বিশ্লেষণ || ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন এবং ’হ্যাঁ/না’ ভোট বিষয়ক কিছু কথা
শেয়ার করুন

শ্বেতা ইরিনা


অবশেষে সব জল্পনা—কল্পনা কাটিয়ে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। দেশের দুই বৃহত্তম দলের অন্যতম আওয়ামী লীগ নানা জটিলতায় এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ভোট কেন্দ্রগুলোয় ভোটারদের প্রদত্ত ভোটের হার ৫৯.৪৪ শতাংশ বলা হলেও সামাজিক মাধ্যমে নেটিজেনদের তোলা নানা ছবি ও ভিডিও থেকে দেখা যাচ্ছে যে অনেক ভোট কেন্দ্রেই ভোট প্রদানের হার বেলা এগারোটা নাগাদ টেনে—টুনে বিশ শতাংশ ও এক ঘন্টার ভেতর ৩২ শতাংশ হয়ে গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রণি একটি পোস্টে কৌতুক করে বলেন যে ১২ তারিখ রাত পোহাতে পোহাতে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশ বলে দেখা যাবে। এছাড়া বিভিন্ন স্থাণে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা জাল ব্যালট পত্র সিল করা, বিপুল পরিমাণ টাকা ছড়ানোসহ নানা অনিয়ম ও কারচুপিরও অভিযোগ উঠেছে।

এসব কিছুর পরও বাংলাদেশে আপাতদৃষ্টে ডানপন্থি এবং ইসলাম—ঘেঁষা দলগুলোর ভেতর অপেক্ষাকৃত ’নরম ইসলামপন্থি’ দল বিএনপিই ভূমিধ্বস বিজয় বা দুই—তৃতীয়াংশ ভোট লাভ করেছে এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের সংসদ নির্বাচনে ইতিহাসে প্রথম জামায়াত সংসদে বিরোধী দল হিসেবে ৬৮টি আসন নিয়ে যোগ দিতে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বৃহত্তম দল লীগের অনুপস্থিতিতে ভোটারদের ভেতর অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল বা মুক্তিযুদ্ধ সমর্থক, নারী এবং ধর্মীয় ও নৃ—তাত্ত্বিক সংখ্যালঘুরা এক ধরণের অসহায়তা থেকেই জামায়াতের তুলনায় বিএনপিকে শ্রেয়তর বিবেচনা করে বিপুলভাবে ভোট দিয়েছে।

গ্রামাঞ্চলে খেটে খাওয়া মানুষেরা জামায়াতের তুলনায় বিএনপিকে বেশি ভোট দিয়েছে বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ছাত্রী শিবির নেত্রী জুমার সামাজিক মাধ্যমে এক ক্ষুব্ধ মন্তব্য থেকে জানা গেছে। অন্য দিকে নাগরিক মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজে জামায়াত বা এনসিপির দিকে খানিকটা ঝোঁক জুলাই ২০২৪—এর পর খানিকটা তৈরি হলেও গত দেড় বছরে এনসিপির মব কার্যক্রমে অতিষ্ঠ মানুষ ভোট বাক্সে তাদের পক্ষে ততটা আলোড়ন তোলেনি।

বিশেষত: জামায়াত সমর্থিত এনসিপির একদমই ’যত গর্জে তত বর্ষে না’ হাল দেখা যাচ্ছে! তবু তারা ছ’টির মত আসন পেয়েছে যা খুব কম কথাও না। যথারীতি বাম দলগুলোরই আবারও হতাশাজনক ও লজ্জাদায়ী ফলাফল হয়েছে। একমাত্র বিএনপির সমর্থনে ’গণ সংহতি’র জোনায়েদ সাকি এবারের নির্বাচনে সংসদে একটি আসন লাভ করেছেন।

এদিকে নির্বাচনে বিএনপি অনানুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী হবার সাথে সাথেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার সামাজিক মাধ্যমে তারেক জিয়াকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি পোস্ট প্রদান করেন।

জুলাই ২০২৪—এ ডান—বাম নানা শক্তির যে মিলিত রাজনৈতিক, জোটবদ্ধ রূপ দেখা দিয়েছিল, তাদের ভেতর অধিকতর ডানপন্থি জামায়াত—এনসিপি বা ইনকিলাব মঞ্চের মত সংগঠনগুলো ওসমান হাদির মৃত্যুর পর এক দিনে ’দ্য ডেইলি স্টার,’ ’প্রথম আলো’ বা ’ছায়ানট’সহ বাংলাদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা অফিস বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে আক্রমণ চালানো ও প্যারিস থেকে ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্য বা ইলিয়াসের মত উগ্র ডানদের আহ্বানে সারা দেশে এক প্রচন্ড নৈরাজ্যকর আবহ তৈরি হলে, খানিকটা দিল্লির মধ্যস্থতাতেই তারেক জিয়া গত বছরের ২৫শে ডিসেম্বর বাংলাদেশে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ফেরেন বলে ঢাকার ওয়াকেবহাল সূত্রগুলো মনে করে।

ইতোপূর্বে বিগত প্রায় দেড় বছরে বা এমনকি তারেক রহমান তার মা খালেদা জিয়ার দূরূহতম রোগশয্যাতে থাকার শেষ দিনগুলোতেও দেশে ফিরছিলেন না।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশে ভারত ও হিন্দুবিরোধী ইসলামী রাজনীতির প্রধান বৃহত্তম দল হচ্ছে বিএনপি। তবে, জামায়াতের মত ধর্মীয় বিষয়ে কঠোর পড়া—শোনা করা কোন নির্দিষ্ট ক্যাডার শ্রেণি না থাকায় বিএনপি মূলত: বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সমাজে এক দীর্ঘ নৈরাজ্যকালীন সময়ে ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের একটি ভোগবাদী পাটাতন যারা ভারত ও হিন্দু—বিরোধী বা ইসলামী শ্লোগান দেবার পরও স্বচ্ছন্দে ক্লাবে মদ্য পান করতে, কোট—ব্লেজার বা শিফন শাড়ি পরতে, ব্যান্ড গান শুনতে অস্বস্তিবোধ করেন না। সাধারণ মানুষের ভেতর বিএনপির তুমুল জনপ্রিয়তাও এ কারণেই।

সাধারণ মানুষ মূলত: ’ধর্ম ও জিরাফ’ দু’টোতেই থাকতে চায়। সে মুম্বাইয়ের বাণিজ্যিক ছবিও দেখতে চায় আবার ধর্মীয় পরিচয়কেও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে চায়। জামায়াতের মত সেজন্য জীবনের সব বিনোদন খারিজ করতেই বা কেন কোটি কোটি মানুষ রাজি হবে?

তবে, এটাও সত্যি যে একাধিক সামরিক ক্যু’দেতার পর যে জিয়াউর রহমান আমাদের দেশে প্রথমে সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, যিনি প্রথম আমাদের সংবিধান থেকে ’ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র’কে মুছে দিয়েছেন, জিয়াকে জেলখানা থেকে মুক্ত করার পুরষ্কার হিসেবে বামপন্থি তবে মুজিব বিরোধী কর্ণেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন বা শত শত মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের ফাঁসির নেপথ্য পুতুল নাচের কারিগর জিয়ার বিএনপি থেকে এরশাদশাহী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ১৯৮২—৯০ নাগাদ প্রায় এক দশকের অক্নান্ত সংগ্রামে তার বিধবা স্ত্রী খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার সাথে যৌথ নেতৃত্ব দান করার সময়, বিএনপি প্রথম কিছুটা গণমানুষের সংগ্রাম ও আন্দোলনের চারিত্র্য অর্জন করে।

১৯৯১—৯৬ ও ২০০১—২০০৬ নাগাদ বিএনপির ট্র্যাক রেকর্ড ভাল এটা আদৌ বলা যাবে না। এক মেয়েদের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষায় উপ—বৃত্তি চালু করা এবং কেবিনেটে প্রাক্তন বাম পাটাতন থেকে আসা পরিবেশ মন্ত্রী শাজাহান সিরাজের কল্যাণে টু—স্ট্রোক বেবি হুইলার তুলে দেয়া বা পলিথিন নিষিদ্ধ করা ব্যতীত বিএনপির ভাল কাজ খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার, সারা দেশে ৬৩টি জেলায় বোমা হামলা, জঙ্গিবাদের উত্থান, ২০০১—এ নির্বাচনে জয়ী হবার পর সংখ্যালঘুদের উপর নারকীয় অত্যাচার, কানসাটে সারের জন্য কৃষক হত্যা, ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, মানিক সাহা বা হুমায়ুন কবীর বালুর মত সাংবাদিক হত্যাসহ অসংখ্য অপকর্ম বিস্তারিত ’বিডি ডাইজেস্ট’—এর সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলা সম্ভবও নয়; আরো বিশেষত: এই প্রবন্ধ গণভোট নিয়েই আলোচনা করতে চাই।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল বিএনপির। ২০০১—এ আলী আহসান মুজাহিদের মত দু’জন যুদ্ধাপরাধী জামায়াতি নেতা বিএনপি কেবিনেটে মন্ত্রী হয়। চট্টগ্রামের রাউজানের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী পরিবারের সন্তান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও বিএনপি নেতা ছিলেন এবং সাকার ভয়ানক সব অশালীন আচরণ আজো আমরা ভয়ের সাথে স্মরণ করি। কাজেই বিএনপি ভারতের যতসহযোগিতা (ভারতেরও জামায়াত ঠেকাতে এই মূহুর্তে বিশেষ কোন পথ হয়তো খোলা ছিল না) ও প্রগতিশীল বা সংখ্যালঘুদের সমর্থনে এবার ক্ষমতায় আসুক, ক্ষমতায় এসেই সে তার এত দিনের ’ডানপন্থি ইসলামী’ রাজনীতি পরিহার করবে, এতটাও প্রত্যাশা করা অনুচিত।

এবং এটাও ভাবা ভুল হবে যে এই নির্বাচনে প্রগতিশীল ও সংখ্যালঘুরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন বলেই আওয়ামী লীগ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে বা ভারতের কাছেই লীগের আর প্রয়োজন নেই। আজ সকালেই ভারতীয় বাঙ্গালী এক সাংবাদিকের সাথে বিএনপির মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতার কথোপকথন ইউটিউবে যতটুকু দেখলাম তাতে স্পষ্টত: মনে হচ্ছিলো যে ভারতীয় সাংবাদিকের দিক থেকে তুলনামূলক অনেকটা আন্তরিক আচরণ থাকলেও বিএনপির মিডিয়া বিভাগের ঐ দায়িত্বপ্রাপ্ত বারবারই গত ১৭ বছর যে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারেনি বা মানুষের ভোট দানের অধিকার ছিল না এসব তিনি বারবার বলছিলেন যা ভারতীয় সাংবাদিকটির ভেতর দৃশ্যমান অস্বস্তি তৈরি করছিল এবং বিএনপির মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুষ্ঠু ভোট আয়োজনের জন্য অন্তর্বতীর্ সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদও জানান।

পশ্চিম বাংলার ’আজ তক’ টিভি চ্যানেলসহ একাধিক টিভি চ্যানেলের সংবাদে ইতোমধ্যে বিএনপিকে মহিমান্বিত করতে বাংলাদেশের এক সংখ্যালঘু ছাত্রী ঈপ্সিতার (২৪) বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে যে বলছে যে আওয়ামী লীগের সময়ে ভোটের ফলাফল জানাই থাকতো বলে সে যেত না। অথবা, পুরান ঢাকার তপন মল্লিক নামে একজন বলেন যে আওয়ামী লীগ তাদের ’ভাঙ্গিয়ে খেয়েছে’ এবং বিএনপি আমলেই তাদের এলাকায় সরকার একটি মন্দির করে দেয়। এখন এই ভোটার পুরান ঢাকায় বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ভোটার হলে তো অন্য কথা।

আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বে বা উন্নত বিশ্বেও শ্বেতকায় ডেমোক্র্যাট নেতাদের ভেতরেও বর্ণ—বিদ্বেষ, ভারতে কংগ্রেস নেতাদের ভেতরেও সূক্ষ মুসলিম বিদ্বেষ বা বাংলাদেশে লীগের নেতাদের ভেতরেও হিন্দু—বিদ্বেষ একশো ভাগই থাকবে না এমন না। তবে শতাংশ হারের বেশ—কমের বিষয় আছে এবং এজন্যই পৃথিবীর সব দেশেই সংখ্যালঘুরা প্রগতিশীল রাজনীতি সমর্থন করে। যাহোক, লিখতে চাচ্ছি যদিও গণভোট বিষয়ে, নির্বাচনের পর কীবোর্ড ছুটছে অন্যত্র।

এবার মূল যে আলোচনার বিষয় হলো সেটা হচ্ছে ’গণভোট।’ বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে ইতোপূর্বে আরো তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সেই গণভোটগুলোয় প্রথম দু’বার যথাক্রমে দুই সামরিক শাসক তথা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও এরশাদের বৈধতা অর্জনের জন্য ’হ্যাঁ/না’ ভোট এবং ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হবার পর রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরার জন্য গণভোট আয়োজিত হয়। এই তিনটি গণভোটই মূলত: একটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল।

অথচ, এবারের গণভোটে ৪৭টি সাংবিধানিক ও ৩৭টি প্রশাসনিক, জটিল সব বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে যার প্রতিটি ইস্যু নিয়ে মতামত দিতে হলে আইন, সংবিধান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদেরও কিছু দিন ভেবে—চিন্তে, পড়া—শোনা করে মত দেওয়া প্রয়োজন।

মূলত: জুলাই সনদকে বৈধতা দিতেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে এবং জুলাই সনদে সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাংলাদেশ সংবিধানের ধারা ৭ (ক) ও (খ) বাতিল করাসহ (যদিও বাংলাদেশ সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ডক্টর কামাল হোসেন ইতোপূর্বে ’দ্য ডেইলি স্টার’ বা ’দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’সহ একাধিক পত্রিকাকে বলেছেন (৪ নভেম্বর, ২০২২) যে ধারা ৭—ই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সকল কাজের ভিত্তি যেহেতু এই ধারায় সংবিধানকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সব মানুষের চূড়ান্ত আশা—আকাঙ্খা ও ইচ্ছার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে) আমাদের রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা (বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র)—কে কুঠারাঘাত করে বাদ দেয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত দ্বি—কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের উচ্চ কক্ষে সাংসদ হবেন কারা? এবারের নির্বাচন ত’ হয়েই গেছে। তথাকথিত ’প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ভেতর ক্ষমতা ভারসাম্যে’র নামে রাষ্ট্রপতিকে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মূল কারণ কি ইউনূসের রাষ্ট্রপতি হবার গোপন অভিলাষ এবং সেজন্যই ১২ তারিখের নির্বাচনের পরও মার্চে ইউনূসের সরকারী পদাধিকারেই বিদেশ ভ্রমণের ছক সাজানো হয়েছিল? সবচেয়ে বড় কথা সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর কিছুই অপরিবর্তনীয় নয় এবং সেই লক্ষ্যে আমাদের সংবিধানেও যুগোপযোগী কিছু সংস্কার আনা যেতেই পারে— তাই বলে একদিনে ৮৭টি বিষয়ে গণভোট? এবং ’হ্যাঁ’ হলে ৮৭টি বিষয়ে ’হ্যাঁ’ এবং ’না’ হলে ৮৭টি বিষয়েই ’না’?

বিএনপি দুই—তৃতীয়াংশ ভোটে ক্ষমতা পেয়ে আসছে ১৬ তারিখেই তারেক জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে এবং ১৮ তারিখ মন্ত্রী পরিষদ তারেক জিয়ার কাছে শপথ নেবেন বলে জানা যাচ্ছে। এবার বিষয় হলো কী হবে গণভোটের? যদিও নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ’হ্যাঁ’ ভোট বিপুলভাবে বিজয়ী বলে দেখানো হচ্ছে, আজকের ’দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে’র একটি প্রতিবেদন থেকেই নিচে খানিকটা উদ্ধৃত করছি:

‘গণভোটের অন্তত পাঁচ আসনের ফলাফল নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) দুটি আসনের ফলাফল সংশোধন করে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করলেও বাকি তিনটি আসনের ফলাফলে অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে।

ইসি রাতে সিরাজগঞ্জ-১ ও রাজশাহী-৪ আসনের গণভোটের ফলাফল পরিবর্তন করে নতুন ফল প্রকাশ করেছে। সংশোধিত ফলাফলে শতকরা হার ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা বেড়েছে এবং কমেছে ‘না’ ভোটের সংখ্যা। তবে নেত্রকোনা-৩, নেত্রকোনা-৪ ও নেত্রকোনা-৫ আসনের ফলাফল অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যেখানে বড় ধরনের গরমিল দৃশ্যমান।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যে দেখা গেছে, নেত্রকোনা-৩, নেত্রকোনা-৪ এবং নেত্রকোনা-৫ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা ওই আসনগুলোর মোট ভোটারের চেয়েও বেশি দেখানো হয়েছে। নেত্রকোনা-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২০ হাজার ৬৮৬ জন হলেও ‘হ্যাঁ’-তে ভোট পড়েছে ৫ লাখ ২ হাজার ৪৩৮টি। অথচ সেখানে প্রদত্ত মোট ভোটের সংখ্যার স্থলে দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৮ ভোট এবং কাস্টিং ভোট দেখানো হয়েছে ৫৬.৬৫৯ শতাংশ। নেত্রকোনা-৪ ও নেত্রকোনা-৫ আসনেও একইভাবে তথ্যের গরমিল রয়েছে।

তবে রিটার্নিং কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ফলাফলের সঙ্গে ইসির প্রকাশিত তথ্যের পার্থক্য স্পষ্ট।

রিটার্নিং কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ফলাফল অনুযায়ী, নেত্রকোনা-৩ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৭টি। এই আসনে ৪ হাজার ৫৬৬টি ভোট বাতিলসহ সর্বমোট প্রদত্ত (কাস্ট) ভোটের সংখ্যা ২ লাখ ১ হাজার ৩৫৮টি। এখানে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৯২।

অন্যদিকে নেত্রকোনা-৪ (আসন নং ১৬০) আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৮২ হাজার ১২৫টি এবং ‘না’ ভোট ১ লাখ ২ হাজার ১১৩টি। ২৭ হাজার ৯৭২টি বাতিল ভোটসহ সর্বমোট ভোট পড়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ২১০টি। এই আসনে মোট বৈধ ভোট ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৩৮টি।

এ ছাড়া নেত্রকোনা-৫ (আসন নং ১৬১) আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৬৭১টি এবং ‘না’ ভোট ৪৪ হাজার ২৭৩টি। এই আসনে ২০ হাজার ৭২০টি বাতিল ভোটসহ সর্বমোট কাস্ট হওয়া ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৪। এখানে মোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৪ (https://www.tbsnews.net/bangla/bangladesh/news-details-454261)।‘

যদিও আপাত:দৃষ্টে তারেক জিয়া এনসিপি বা জামায়াতের নেতাদের শুরুতে বলেছেন যে তিনি বা তার দল ’হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকবেন, তবে মাঠ পর্যায়ে বিএনপি তার নেতাকর্মীদের ’না’ ভোট দিতেই বলেছে বলে বাতাসে খবর উড়ছে। এরপরও গত দেড় বছরে ইন্টেরিম সরকারের মূল দুই শক্তি জামায়াত ও এনসিপি ’হ্যাঁ/না’ ভোটে কারচুপি করলেও পত্রিকাগুলোয় এই যে অসঙ্গতির খবর আসছে, তা’ বিএনপির সূক্ষ নির্দেশেই কীনা কে জানে? তবে শুধু বিএনপির উপর ভরসা করলেও চলবে না। দেশের সব প্রগতিশীল মানুষকেই এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

আশা করা যায় একটি বিশাল অন্ধকার শক্তির এই অপচেষ্টাও রুখে দেয়া যাবে।

Visited 22 times, 1 visit(s) today