কৃষিখাতে চরম বৈষম্য, সহজে কৃষিঋণ পাচ্ছেন না চাষি

কৃষিখাতে চরম বৈষম্য, সহজে কৃষিঋণ পাচ্ছেন না চাষি
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কৃষক মোসাদ্দেক হোসেন এবার বোরো মৌসুমে আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। আগের বছরের বন্যায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেয়েছিলেন বেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে। স্থানীয় ব্যাংক শাখায় ঋণের আবেদনও করেন। কিন্তু কয়েক দফা কাগজপত্র যাচাই, জামানত সংক্রান্ত জটিলতা আর দীর্ঘ অপেক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত ঋণ পাননি তিনি।

শেষ পর্যন্ত চড়া সুদে স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চাষ শুরু করেন। এখন তার শঙ্কা—ফসল ভালো না হলে কিস্তি শোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আবদুল করিমের অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়; মাঠপর্যায়ে অনেক কৃষকই বলছেন, সহজে কৃষিঋণ পাওয়া যায় না।

কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তব চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি এই খাত হলেও ব্যাংকঋণে এর অংশ খুবই সীমিত। একদিকে কিস্তি আদায়ে কঠোরতা, অন্যদিকে নতুন ঋণ বিতরণে অনীহা—এই দ্বৈত চাপে পড়েছেন কৃষকেরা।

অভিযোগ রয়েছে, আদায়ে ব্যাংক যতটা তৎপর, নতুন অর্থায়নে ততটাই ধীর। ফলে প্রয়োজনমতো ঋণ না পেয়ে অনেকের উৎপাদন পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে, নির্ধারিত বিনিয়োগ থেমে থাকছে, কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও একই ইঙ্গিত দেয়। ঋণ পেতে এখনো পেরোতে হয় নানা ধাপ, সামলাতে হয় কাগজপত্রের চাপ। অনেক ক্ষেত্রে দালালনির্ভরতার অভিযোগও আছে। এতে কৃষকের আগ্রহ কমছে, আস্থা দুর্বল হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি যখন অর্থনীতির ভিত্তি, তখন এ খাতে ঋণের সীমিত প্রবাহ শুধু আর্থিক বৈষম্য নয়; ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও এটি ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর শেষে কৃষিঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে সব খাতে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। সে হিসাবে মোট ঋণের মাত্র ২ দশমিক ১৬ শতাংশ গেছে কৃষিতে। অথচ দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ শ্রমশক্তি কাজ করে এই খাতে।

মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবু ব্যাংকগুলোর নিট ঋণের লক্ষ্য কৃষিতে মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষির গুরুত্বের তুলনায় এ হার খুবই কম এবং বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়; বরং তা কৃষকদের প্রতি নীতিগত অবহেলার ইঙ্গিত দেয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে কৃষি খাতে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ এক বছরে বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা; শতাংশের হিসাবে বৃদ্ধি ৯ দশমিক ৬৯। একই সময়ে ঋণ আদায় হয়েছে ২১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি।

সে হিসাবে আগের অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আদায় হয়েছিল প্রায় ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আদায় বেড়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। সংখ্যার এই হিসাব বলছে, বিতরণ বাড়লেও আদায়েও জোর রয়েছে। মাঠের অনেক কৃষকের অভিযোগ, নতুন ঋণ পেতে যত জটিলতা, কিস্তি আদায়ে ততটাই কঠোরতা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকের ঋণখেলাপির হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও ব্যাংকগুলো নানা অজুহাতে কৃষিঋণ দিতে অনাগ্রহী। ফলে প্রয়োজনের সময় প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন না পেয়ে অনেকেই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

তবে মাঠের কৃষকেরা বলছেন, নীতিগত ঘোষণা নয়—সহজ শর্তে দ্রুত ঋণপ্রাপ্তিই তাদের প্রধান চাহিদা। যতদিন না সেই বাস্তব পরিবর্তন আসছে, ততদিন কৃষিঋণ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান কৃষকের জীবনে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি এনে দিতে পারবে না।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, অতীতের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন পুনরুদ্ধারে বেশি ঋণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলোর অনীহার কারণে ঋণের প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। এতে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক–এর মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে ঋণ বিতরণ সহজ করতে ব্যাংক শাখার পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং, সাব-ব্রাঞ্চ, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ও এরিয়া অ্যাপ্রোচ পদ্ধতিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।

Visited 9 times, 1 visit(s) today