নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ, ১৯ ফেব্রুয়ারি—ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জন্মদিন। এই দিনে আমরা স্মরণ করি এক অসাধারণ নারীকে, যিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনা, সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের খ্যাতিমান ভাস্কর। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, বেদনা, সাহস এবং সৃজনশীলতার এক অবিস্মরণীয় গাথা।
সাম্প্রদায়িক ও অশুভ শক্তিগুলো নিয়মিত পেছনে লেগে থেকেছে তার। কখনো রটিয়েছে কুৎসা, আবার কখনো দিয়েছে প্রাণনাশের হুমকি। কিন্তু ভয়ভীতি দেখিয়ে দুই লাখ বীরাঙ্গনার প্রতিনিধিত্ব করা প্রিয়ভাষিণীকে দমিয়ে রাখা যায়নি। ব্যক্তিজীবনে ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ৬ সন্তানের জননী এই নারী নিজে ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। ব্যক্তিজীবনে এই ভাস্কর তাঁর শিল্পকর্মের কারণে দেশ-বিদেশে যেমন সমাদৃত হয়েছেন, তেমনি পুরস্কারও পেয়েছেন অসংখ্য।
২০১০ পরবর্তী প্রজন্ম বিশেষ করে নারী ও তরুণীদের জন্য এক অমেঘ সাহস ও স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। তাঁর সাহসিকতা ও খোলামেলা বয়ান নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছে যে, অতীতের যন্ত্রণাকে লুকিয়ে না রেখে সত্যের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ানোই সত্যিকারের মুক্তি।
২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে উত্থিত গণজাগরণ মঞ্চ—যেখানে লাখো তরুণ-তরুণী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের জন্য রাস্তায় নেমে এসেছিল—সেখানে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ছিলেন এক অগ্নিশিখা। তিনি নিয়মিত শাহবাগে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন, সংহতি প্রকাশ করেন এবং তরুণ প্রজন্মকে উদ্দীপ্ত করেন। তিনি বলেছিলেন,
“আজ তরুণ সমাজ জাগ্রত হয়ে একাত্তরের সেই চেতনা ফিরিয়ে এনেছে। এই গণজাগরণের চেতনা, একাত্তরের চেতনা।”
তাঁর উপস্থিতি ও কথায় নতুন প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের—বিশেষ করে বীরাঙ্গনাদের—প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে শিখেছে। তিনি সহিংসতা বন্ধের দাবিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন, বিভিন্ন সমাবেশে অংশ নেন এবং খালেদা জিয়াসহ রাজনৈতিক নেতাদের যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তাঁর এই সক্রিয় অংশগ্রহণ নারী ও তরুণীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারণ, যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অটুট শ্রদ্ধা জাগিয়ে তুলতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে—যা আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে।
১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। বাবা সৈয়দ মাহবুবুল হক ছিলেন শিক্ষক, মা রওশন হাসিনা। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। শৈশব কেটেছে খুলনা ও ঢাকায়। শিক্ষা গ্রহণ করেন খুলনার পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, খুলনা গার্লস স্কুল থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি।
১৯৭১-এর ভয়াবহ অধ্যায়
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি নির্যাতিত হন। বীরাঙ্গনাদের মধ্যে তিনিই প্রথম সাহস করে ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে জনসমক্ষে নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই সাহসিকতা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাইলফলক। তিনি বলেছিলেন, “একাত্তরে পেয়েছি দৈহিক যন্ত্রণা, স্বাধীন দেশে পেয়েছি মানসিক যন্ত্রণা।” তাঁর বয়ান জাতিকে যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা বুঝিয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি
দীর্ঘদিন পর ২০১৬ সালে (২০১৭ সালের ১১ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে) তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেদিন তিনিসহ ১২৩ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম ওঠে। এটি ছিল তাঁর জীবনের এক বড় প্রাপ্তি।
শিল্পী জীবন ও অবদান
মুক্তির পর তিনি শিল্পের জগতে মনোনিবেশ করেন। প্রাকৃতিক উপাদান—গাছের শিকড়, বাকল, ডালপালা, কাঠ দিয়ে তিনি অসাধারণ ভাস্কর্য সৃষ্টি করেন। তাঁর কাজে মানবতা, মুক্তিযুদ্ধ, দেশের মাটি ও মানুষের জীবন ফুটে ওঠে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, এফএও, কানাডিয়ান দূতাবাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। শিক্ষকতাও করেছেন কিছুদিন। শেষ জীবনে শিল্প সৃষ্টিতে নিজেকে সমর্পণ করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
তাঁর শিল্পকর্ম ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়া হিরো বাই দ্য রিডার্স ডাইজেস্ট, চাঁদেরনাথ পদক, অনন্য শীর্ষ পদক, রৌপ্য জয়ন্তী পুরস্কার (ওয়াইডব্লিউসিএ), মানবাধিকার পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন।
বিদায়
২০১৮ সালের ৬ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৭১ বছরের এই লড়াকু জীবন শেষ হয়, কিন্তু তাঁর সাহস, শিল্প ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরকাল জাগিয়ে রাখবে আগামী প্রজন্মকে।আজ তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই এই মহীয়সী নারীকে—যিনি বেদনাকে শক্তিতে, নির্যাতনকে সৃষ্টিতে রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়: সাহস থাকলে যেকোনো অন্ধকারকে আলোয় পরিণত করা যায়।জয় বাংলা! জয় বীরাঙ্গনা!
