নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যেখানে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়ার আশাবাদ ব্যক্ত করছে, সেখানে নির্বাচন পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটে অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান সেই আশাবাদের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত প্রায় ১৭ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধনই করেননি। আর মোট নির্বাচনকর্মীর অনুপাতে ভোট দিয়েছেন মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ, যা নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
১৭ লাখ নির্বাচনকর্মীর অর্ধেকের বেশি নিবন্ধনই করেননি
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। এই ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম।
পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮ জন, যা মোট নির্বাচনকর্মীর প্রায় ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৯ লাখ ৩৯ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী—অর্থাৎ মোটের প্রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ—ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধনই করেননি।
নিবন্ধিতদের মধ্যেও ভোট দেননি ৪০ শতাংশ
নিবন্ধিত নির্বাচনকর্মীদের মধ্যেও ভোটদানের হার শতভাগ নয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনকারীদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৭ জন। অর্থাৎ নিবন্ধিতদের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট দিয়েছেন, আর প্রায় ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ নিবন্ধন করেও ভোট দেননি।
সব মিলিয়ে মোট ১৭ লাখ নির্বাচনকর্মীর মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন মাত্র প্রায় ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। নির্বাচন পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত এই শ্রেণির ভোটারদের এমন কম অংশগ্রহণ নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৯৫ শতাংশ প্রবাসীই করেননি নিবন্ধন, নিবন্ধন করেও ভোট দেননি ৩৪ শতাংশ
প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হলেও অংশগ্রহণের চিত্র প্রত্যাশার ধারেকাছেও নেই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশির সংখ্যা আনুমানিক দেড় কোটি থেকে এক কোটি ৫৫ লাখের মধ্যে। তবে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন, যা মোট প্রবাসীর প্রায় ৫ শতাংশ।
রোববার রাত পর্যন্ত ভোট জমা পড়েছে ৫ লাখ ৬ হাজার ২৪৭টি। অর্থাৎ নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারদের প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোট দিয়েছেন এবং প্রায় ৩৪ শতাংশ নিবন্ধন করেও ভোট দেননি।
মোট প্রবাসী জনসংখ্যার অনুপাতে হিসাব করলে দেখা যায়, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন মাত্র প্রায় ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ প্রবাসী ভোটার। ফলে প্রবাসী ভোটের অংশগ্রহণ কার্যত প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কী বলছে
বিগত নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল, সেসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বেশি ছিল।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪২ শতাংশ। ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ ১৬টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮০ শতাংশ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। এই তিনটি নির্বাচনেই কারচুপির অভিযোগ উঠেছে; বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ হিসেবে সমালোচিত হয়।
অন্যদিকে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে ৭৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
ভোটার উপস্থিতি নির্ভর করছে ভোটের দিনের বাস্তবতায়
ইসি সূত্র জানায়, ভোটের দিন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের আচরণ এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর ভোটার উপস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ভোট পড়ার হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে। তবে সংঘর্ষ, সহিংসতা বা উত্তেজনা তৈরি হলে ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচন ঘিরে মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা গেলেও বিগত তিনটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া ভয় ও অনাস্থা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
ইসির আশাবাদ বনাম বাস্তব চ্যালেঞ্জ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়ার ইসি’র আশাবাদের সরাসরি বিপরীতে রয়েছে নির্বাচন পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটে অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত প্রায় ১৭ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধনই করেননি।
আর মোট নির্বাচনকর্মীর অনুপাতে ভোট দিয়েছেন মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ, যা নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ভোটার উপস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বিঘ্নে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখতে পাচ্ছি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এ নির্বাচনে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়বে।”
তবে নির্বাচন পরিচালনায় যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটে সীমিত অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান দেখিয়ে দিচ্ছে—ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
