বিনিয়োগে বিদেশিদের অনাগ্রহ দেশের অর্থনীতিতে খারাপ প্রভাব ফেলছে, স্বীকার করলেন গ্রামীণফোনের সিইও

বিনিয়োগে বিদেশিদের অনাগ্রহ দেশের অর্থনীতিতে খারাপ প্রভাব ফেলছে, স্বীকার করলেন গ্রামীণফোনের সিইও
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের টেলিকম খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে গেছে বলে স্বীকার করলেন গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াসির আজমান। এ কারণে শুধু দেশের টেলিকম খাতই নয় দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগেও প্রভাব পড়েছে।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের আগ্রহে দেশে ইলন মাস্কের স্টারলিংকে নিয়ে আসা হয়েছে। তারা সরকারের নানা সুবিধা ভোগ করছে বলে অভিযোগ আছে।

গত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ইয়াসির আজমান বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখন খুবই কম, যা দেশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।

তিনি জানান, এই শঙ্কা কেবল গ্রামীণফোনের নয়, বরং মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সভাপতি হিসেবে অন্য অপারেটরদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র তিনি দেখছেন। বিনিয়োগে এই ভাটায় অর্থনীতিতেও সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে।

বিনিয়োগে এই অনীহার প্রধান কারণ হিসেবে তিনি অতিরিক্ত করের চাপ এবং বছরের পর বছর ঝুলে থাকা আর্থিক বিরোধের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রায় ২৮ বছর ধরে অপারেশনে থাকলেও কোনো বছরই অডিট আপত্তির পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি হয়নি। তিনটি বড় মোবাইল অপারেটরের বিনিয়োগকারীই বিদেশি হওয়ায়, এই অনিশ্চয়তা তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর্থিক বিরোধের সমাধান হিসেবে ইয়াসির আজমান আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের পথকে কার্যকর বলে মনে করেন।

তার মতে, দেশের আদালতে এসব মামলা নিষ্পত্তি হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, যার ফলে সুদের বোঝা আরও বাড়বে। বর্তমানে শুধু গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রেই প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক বিরোধ ঝুলে আছে। একই অবস্থায় রয়েছে রবি ও বাংলালিংকও। আন্তর্জাতিক সালিশির মাধ্যমে দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

টেলিকম খাতকে অত্যন্ত পুঁজিনির্ভর উল্লেখ করে গ্রামীণফোনের সিইও বলেন, পর্যাপ্ত বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া এই খাত দীর্ঘদিন টেকসই রাখা কঠিন। টাওয়ার কোম্পানি ও এনটিটিএনগুলোর আর্থিক দুরবস্থার কথাও তিনি তুলে ধরেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও স্থানীয় অংশীদারিত্বের সমন্বয় ছাড়া এই সংকট কাটানো যাবে না।

মোবাইল সেবার করকাঠামো নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইয়াসির আজমান। তিনি জানান, বাংলাদেশের মতো এত উচ্চ কর বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই। প্রতি ১০০ টাকা আয়ের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশই চলে যায় কর ও ভ্যাটে। এর ওপর রয়েছে পরিচালন ব্যয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা বিধিনিষেধ, যা নতুন সেবা ও উদ্ভাবনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

গ্রাহকদের দৃষ্টিতে মোবাইল ডেটা ও কলসেবার খরচ বাড়লেও অপারেটরদের আয়ের চিত্র তেমন বাড়েনি বলে জানান তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রাহকের মোট ব্যয় বাড়ছে মূলত ডেটা ব্যবহারের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে, যদিও প্রতি মেগাবাইট ডেটার দাম গত বছরই কমানো হয়েছে।

ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ডেটার দামের পার্থক্যের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ব্রডব্যান্ড সেবায় কর মাত্র ৫ শতাংশ, যেখানে মোবাইল অপারেটরদের দিতে হয় ৫৫ শতাংশ। এই বড় ব্যবধান থাকায় দামের পার্থক্য স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হচ্ছে।

ডেটার ব্যবসা এখনো ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে ইয়াসির আজমান বলেন, ভয়েস কল থেকে আয় থাকার কারণেই এখনো ডেটায় সাবসিডি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে ভয়েস কলের ব্যবহার দ্রুত কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই ভারসাম্য রাখা কঠিন হবে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে গ্রামীণফোন লাভজনক অবস্থায় নাও থাকতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী গত দেড় বছরে প্রায় ৯০ লাখ মোবাইল গ্রাহক কমে যাওয়ার বিষয়েও তিনি ব্যাখ্যা দেন।

তার মতে, আইএসপি সেবার বিস্তার, দুর্বল সামষ্টিক অর্থনীতি এবং দামের সামান্য পরিবর্তনেও গ্রাহক হারানোর প্রবণতা এর পেছনে কাজ করছে। চলতি বছর তিনটি অপারেটরের কারও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হবে না বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

Visited 7 times, 1 visit(s) today