জলে-স্থলে বছরে মিলছে হাজারো লাশ, বেশিরভাগের দাফন অজ্ঞাত পরিচয়ে

জলে-স্থলে বছরে মিলছে হাজারো লাশ, বেশিরভাগের দাফন অজ্ঞাত পরিচয়ে
শেয়ার করুন

শুধু ঢাকাতেই এক বছরে মিলেছে সাড়ে ৬শ লাশ

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক

২০২৪-এর আগস্ট থেকেই সমগ্র দেশ হয়ে উঠেছে এক মৃত্যু উপত্যকা। যেখানে-সেখানে মিলছে লাশ্। প্রতিদিনই দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে হত্যা এবং অজ্ঞাত পরিচয় লাশ উদ্ধারের সংবাদ সাধারণ মানুষের মনে এতটাই বিরূপ প্রভাব ফেলেছে যে, একপর্যায়ে এখন মানুষ একে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছে। ফলে অজ্ঞাত পরিচয় লাশের খবর চাপা পড়ে যাচ্ছে নতুন লাশ উদ্ধারের ঘটনায়।

২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া মোট ৬৪৩টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানে দাফন ও সৎকার করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৪৬১ জন এবং জুরাইন কবরস্থানে ১৭৫ জনের লাশ দাফন করা হয়। অন্য ধর্মাবলম্বী ৭ জনের লাশ পোস্তগোলা শ্মশানে দাহ করা হয়েছে। সে হিসাবে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫৪টি এবং প্রতিদিন প্রায় দুইটি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ দাফন ও সৎকার করা হয়েছে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ মাসে দেশে মোট ৪ হাজার ৭৩২টি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বেওয়ারিশ হিসেবে ৫৭০টি লাশ দাফন করা হয়েছিল। সে তুলনায় ২০২৫ সালে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বেড়েছে ৭৩টি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাত বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলস্বরূপ বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র লাশ উদ্ধার হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হচ্ছে। লাশ উদ্ধারের ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ জেলা শীর্ষে রয়েছে। গত বছর শুধু নদী থেকেই ৪৪০টি মরদেহ উদ্ধার করা হলেও এর মধ্যে ১৪১ জনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মোহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, উদ্ধার করা লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তা দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই, কারণ দীর্ঘ সময় লাশ সংরক্ষণের সুযোগ থাকে না।

মানবাধিকার সাংস্কৃতিক সংগঠন (এমএসএফ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে অল্পসংখ্যক অজ্ঞাতপরিচয় লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও অধিকাংশ লাশই অজ্ঞাত থেকে গেছে। অজ্ঞাতপরিচয় লাশ শনাক্তে ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও এমএসএফের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ৬৪১টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার করা হয়। এমএসএফ বলেছে, শুধু লাশ উদ্ধারের তথ্য জানানোই যথেষ্ট নয়; লাশের পরিচয় শনাক্ত করে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

২০২৫ সালে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ৫১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৪ জন, মার্চে ৫৭ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মেতে ৫৩ জন, জুনে ৬০ জন, জুলাইয়ে ৭০ জন, আগস্টে ৪৫ জন, সেপ্টেম্বরে ৫৯ জন, অক্টোবরে ৭২ জন, নভেম্বরে ৬৯ জন এবং ডিসেম্বর মাসে ৩৪ জনের লাশ দাফন করা হয়েছে।

এ ছাড়া পোস্তগোলা শ্মশানে ফেব্রুয়ারিতে তিনজন, মার্চে একজন, জুলাইয়ে একজন, অক্টোবরে একজন এবং নভেম্বরে একজনের লাশ দাহ করা হয়। সে অনুযায়ী রায়েরবাজার কবরস্থানে জানুয়ারিতে ৫১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪১ জন, মার্চে ৫৬ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মেতে ৫৩ জন, জুনে ৬০ জন, জুলাইয়ে ৫০ জন, আগস্টে ২৩ জন, সেপ্টেম্বরে ২৩ জন, অক্টোবরে ৪০ জন, নভেম্বরে ২৮ জন এবং ডিসেম্বর মাসে সাতজনের লাশ দাফন করা হয়েছে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম সূত্র জানায়, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ১৫ বছরে সংস্থাটি মোট ১৪ হাজার ৮৭৬টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ বলেন, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না। লাশ বহনের জন্য কোনো ধরনের অর্থ নেওয়া হয় না; সংস্থার নিজস্ব গাড়িতে করে সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় মনে করে লাশ উদ্ধার করলেই তাদের দায়িত্ব শেষ। অথচ লাশের পরিচয় শনাক্ত, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করে মরদেহ আত্মীয়-স্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়াও তাদের দায়িত্বের অংশ।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলার নদী যেন অপরাধীদের জন্য লাশ গুম করার ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

নৌ পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও পরিচয় শনাক্ত করা না যাওয়ায় অধিকাংশ হত্যা মামলার সুরাহা করা সম্ভব হচ্ছে না।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একজন কর্মকর্তা বলেন, কেউ নিখোঁজ হলে পরিবারের উচিত তাৎক্ষণিকভাবে থানাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পরিবার পাঁচ থেকে সাত দিন পর সাধারণ ডায়েরি করে, ফলে তদন্ত কার্যকরভাবে এগোয় না। এ কারণেই বহু লাশ অজ্ঞাত থেকে যায়।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু ইউসুফ বলেন, সাধারণত পচে যাওয়া মরদেহের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা যায় না। আবার ছিন্নমূল ও ভবঘুরে মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় তাদের লাশ শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উন্নত দেশগুলোতে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিজস্ব পরিচিতি ব্যবস্থা থাকায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের অভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় ওয়ারিশ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

তিনি আরও বলেন, আদর্শ তদন্ত টিমে একজন ম্যাজিস্ট্রেট, সিআইডি কর্মকর্তা, তদন্ত কর্মকর্তা, লিয়াজোঁ অফিসার, প্যাথলজিস্ট ও চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও দেশে এ ধরনের সমন্বিত টিম সচরাচর গঠন করা হয় না। পাশাপাশি ক্রাইম সিন সুরক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রয়োজনীয় আলামতের অভাব তদন্তকে আরও জটিল করে তোলে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়ক, নদী ও খাল থেকে উদ্ধার হওয়া বেওয়ারিশ লাশ প্রথমে বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরিচয় নিশ্চিত না হলে এসব মরদেহ শেষ পর্যন্ত বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

সর্বশেষ রাজধানীর পল্লবীর একটি ডোবা ও তুরাগের একটি লেক থেকে দুই ব্যক্তির অর্ধগলিত ভাসমান লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল পর্যন্ত তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। নিহতদের বয়স আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। গত মঙ্গলবার বিকেলে লাশ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

পল্লবী থানার উপপরিদর্শক মো. শামছুর রহমান বলেন, স্থানীয় লোকজন ডোবায় একটি লাশ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দিলে তা উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার পর মরদেহটি ডোবায় ফেলা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হবে।

নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৩০১ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০৯ জনের পরিচয় শনাক্ত হলেও ৯২ জন এখনো অজ্ঞাত। গত বছর নদী থেকে উদ্ধার হওয়া ৪৪০টি মরদেহের মধ্যে ১৪১ জনের পরিচয় আজও অজানা। মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চলতি বছর বিভিন্ন থানায় অন্তত ৪১টি হত্যা মামলা হয়েছে, যেখানে গত বছর মামলার সংখ্যা ছিল ৫৩টি।

স্থানীয় থানা লাশের ছবি ও তথ্য সংরক্ষণ করলেও তিন দিনের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত না হলে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নৌ পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি কুসুম দেওয়ান বলেন, নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্ত করাই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিডিপ্রতিদিন

Visited 14 times, 1 visit(s) today