ভোটের আগেই ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগে তাড়াহুড়ো: প্রশ্নফাঁসেই শিবির ক্যাডারদের নিয়োগ

ভোটের আগেই ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগে তাড়াহুড়ো: প্রশ্নফাঁসেই শিবির ক্যাডারদের নিয়োগ
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজার ৩৮৫ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ও স্বল্প সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের পরিকল্পনা নিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের একাংশের মধ্যে সন্দেহ ও অসন্তোষ বাড়ছে।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও চাকরিপ্রার্থীদের বিভিন্ন ফোরামে প্রশ্ন উঠছে—এই দ্রুত নিয়োগের পেছনে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা আছে কি না।

অভিযোগ আছে, জামায়াতে ইসলামী’র নেতাদের দ্বারা সারাদেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে এ নিয়োগ হয়েছে, পরীক্ষার সময়ও একাধিক জামায়াত নেতার বাসা থেকে আটকের ঘটনাও ঘটেছে।

এ নিয়োগের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর পরিবারের সদস্য ও শিবির কর্মীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন চাকরিপ্রত্যাশী আন্দোলনকারীদের অনেকেই।

এমনকী এদেরকে ব্যবহার করে ভোটের মাঠেও সুবিধা নিতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার ও জামায়াতে ইসলামী।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ নভেম্বর প্রথম ধাপে এবং ১২ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। প্রথম ধাপে ৮ থেকে ২১ নভেম্বর এবং দ্বিতীয় ধাপে ১৪ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন নেওয়া হয়। এরপর ২ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে তা পিছিয়ে ৯ জানুয়ারি নেওয়া হয়।

পরীক্ষা শেষের পরই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ কমিটির বৈঠকে ২০ জানুয়ারির মধ্যে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং দ্রুত মৌখিক পরীক্ষা শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। অধিদপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তিন মাসের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে—যা অতীতের যে কোনো নিয়োগের তুলনায় অনেক দ্রুত বলে দাবি করছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা।

চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, এর আগে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে এত দ্রুত সময়ের মধ্যে লিখিত পরীক্ষা, ফল প্রকাশ ও মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি। নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করতে চাইছে—এমন ধারণা থেকে তারা প্রশ্ন তুলছেন, এই তাড়াহুড়োর আড়ালে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না।

পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনকারী চাকরিপ্রত্যাশী আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা “দিবালোকের মতো স্পষ্ট”। তার দাবি, পরীক্ষার আগেই একটি চক্র প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় এবং পরীক্ষার হলে ডিভাইসের মাধ্যমে উত্তর সরবরাহ করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, এই চক্রের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কিছু শিক্ষা কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন।

এদিকে পরীক্ষার সময় নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৯০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষায় ৯০ মিনিট সময় দেওয়াকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের যুক্তি, এই সময়ের মধ্যেই প্রশ্ন বাইরে পাঠানো ও উত্তর ফেরত আনার সুযোগ তৈরি হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরীক্ষার সময় নিয়ে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে আলোচনা হলেও তা পরিবর্তন করা হয়নি।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, শিক্ষক নিয়োগে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা তাড়াহুড়ো নেই। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। শূন্য পদ পূরণ এবং ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পদোন্নতির ফলে ভবিষ্যতে আরও বড় শূন্যতা তৈরি হবে—এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনের আগে নিয়োগ শেষ করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই। তফসিল ঘোষণার পরও নিয়োগে আইনগত কোনো বাধা নেই। এটি অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রশাসনিক কাজের অংশ।

চাকরিপ্রত্যাশীদের একাংশ মনে করছেন, প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না করে দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হবে। তাদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা হলে ভবিষ্যতে এই নিয়োগ ঘিরে আরও বড় বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

Visited 16 times, 1 visit(s) today