ইরানের বিক্ষোভে ২ হাজারেরও বেশি প্রাণহানি: ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে রক্তের নদী বইয়েছে রক্ষণশীল খামেনেয়ী সরকার

ইরানের বিক্ষোভে ২ হাজারেরও বেশি প্রাণহানি: ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে রক্তের নদী বইয়েছে রক্ষণশীল খামেনেয়ী সরকার
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

তেহরান/ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬: ইরানে গত দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন—এই তথ্য প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, এই সহিংসতার জন্য দায়ী “সন্ত্রাসী গোষ্ঠী”, যারা বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনী—দুই পক্ষকেই লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

কিন্তু এই ব্যাখ্যা অনেকের কাছে দায় এড়ানোর কৌশল বলে মনে হচ্ছে, কারণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই সরকারি বাহিনীর গুলি, লাঠিচার্জ ও দমনমূলক অভিযানের ফল।

এই ঘটনা থেকে একটি গুরুতর তুলনা উঠে আসে—বাংলাদেশের আগস্ট ২০২৪ এর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সেই সময়ে আন্ডোলনের দুই সপ্তাহ নীরব থাকলেও, জুলাই এর ১৬ তারিখের পর এসে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের বিশৃঙ্খলাকারীদের হাত থেকে রাষ্ট্রের জান মাল রক্ষায় কঠোর অবস্থা গ্রহন করে। আইনিশৃঞখলা বাহিনী একইসাথে আন্দোলনাকারীডের উগ্রাবাদী হামলায় শত মানুষ নিহত হয় (বিভিন্ন সূত্রে ৩০০ থেকে ৬০০+ প্রাণহানি, যার মধ্যে পুলিশ সদস্য, সরকারী দলের নেতাকর্মিরাও ছিলেন)। পরিস্থিতি যখন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল এবং সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে বিশৃঙ্খলাকারীদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে, তখন আরো প্রাণহানী এড়াতে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৫ আগস্ট ২০২৪-এ তিনি পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন এবং সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। ফলে আরও বড় রক্তপাত এড়ানো যায়।

অথচ ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনকে “সন্ত্রাসী হামলা” বলে চিহ্নিত করে সরকার কঠোরতম দমননীতি অবলম্বন করেছে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেফতার ও লাইভ ফায়ারিংয়ের মাধ্যমে তারা ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত ২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে—যা বাংলাদেশের আন্দোলনের তুলনায় অনেক বেশি।

মূল পার্থক্য স্পষ্ট: বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার যখন দেখলেন আরও প্রাণহানি এড়ানো যাবে না এবং সেনাবাহিনী সহযোগিতা করছে না, তখন তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশ ত্যাগ করেন—যাতে আরও রক্তপাত না হয়। কিন্তু ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকাই প্রধান লক্ষ্য। ফলে তারা “সন্ত্রাসী” বলে অভিযোগ তুলে নিজেরাই ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এই তুলনা থেকে বোঝা যায়—একটি সরকার যখন জনগণের জীবনের চেয়ে নিজের ক্ষমতাকে বেশি মূল্য দেয়, তখন রক্তের নদী বইতেই থাকে।

বাংলাদেশের জুলাই-আগস্ট বিপ্লব দেখিয়েছে যে, ক্ষমতা ছাড়ার সাহস থাকলে বড় বিপর্যয় এড়ানো যায়। ইরানের বর্তমান ঘটনা দেখাচ্ছে—ক্ষমতার লোভে কতটা মানুষের প্রাণ যেতে পারে।

Visited 8 times, 1 visit(s) today