মতামত।। খালেদা জিয়া ও এক অধ্যায়ের হিসাব: শোক, সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দ্ব্যর্থক উত্তরাধিকার

মতামত।। খালেদা জিয়া ও এক অধ্যায়ের হিসাব: শোক, সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দ্ব্যর্থক উত্তরাধিকার
শেয়ার করুন

-ডঃ শ্যামল দাস

বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, তীব্রভাবে মেরুকৃত অধ্যায়ের অবসান ঘটল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া-র মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়; এটি স্বাধীনতা–উত্তর রাষ্ট্রগঠনের এক বিশেষ ধারার রাজনৈতিক প্রকল্পের আপাতঃ পরিসমাপ্তি। এই মুহূর্তে শোক যেমন অনিবার্য, তেমনি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে তাঁর উত্তরাধিকারকে নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করাও জরুরি।

খালেদা জিয়ার উত্থান ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী এবং ঐতিহাসিক ঘটনা। একটি কঠিন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাঁর উত্থান অবশ্যই রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসে চর্চিত হবে একদিন। একসময় গৃহকেন্দ্রিক জীবনে সীমাবদ্ধ একজন নারী ধীরে ধীরে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন—যা শক্ত পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোতে বিরল; তার ওপর সমাজে নারীবিরোধী ধর্মীয় কুসংস্কারও প্রবল। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেখানে তিনি বিএনপিকে সংগঠিত করেন, দলীয় কাঠামো পুনর্গঠন করেন এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে দলকে কার্যকর শক্তিতে রূপ দেন। তিনি বিএনপি ও এটির সমর্থকদের জন্য হয়ে ওঠেন ঐক্যের প্রতীক। স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসস্বীকৃত; সেই সময় শেখ হাসিনা-র সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

এই অর্জনগুলো শোকলেখায় স্বীকার করাই ন্যায্য। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রকল্প যে পথ বেছে নেয়, তা ক্রমেই দল ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন Coalition Contamination—যখন একটি মূলধারার দল এমন শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধে, যাদের ঐতিহাসিক ও নৈতিক বোঝা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অত্যন্ত ভারী। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-কে নিয়ে সরকার গঠন বিএনপিকে ক্ষমতা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে দলটির নৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সংকুচিত করে।

খালেদা জিয়ার সময় প্রেক্ষিত বিবেচনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কিছুটা স্থিতিশীল পরিস্থিতি বজায় থাকলেও মোটা দাগে এটি জনমানুষের উপকারে আসেনি। সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় প্রবৃদ্ধি খারাপ নয়, কিন্তু মনে রাখা দরকার তাঁর সময় কোভিড বা যুদ্ধবিগ্রহের ও আন্তদেশীয় সংঘ র্ষের কারনে আন্ত র্জাতিক বাজারের চাপ ছিলোনা বাংলাদেশের ওপর। তবুও যে প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যায়নি এর বড় কারনটি ছিলো ছিলো তাঁর শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত ও নৈতিক দূর্বলতার ফল।

উদাহরন দেয়া যাক আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট থেকে। খালেদা জিয়ার সময় শাসনব্যবস্থা নৈতিক কাঠামোটি অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছিলো। এই কাঠামোগত ভাঙনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানেই পাওয়া যায়। ২০০১ থেকে ২০০৫—টানা পাঁচ বছর—বাংলাদেশ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় এই অভিজ্ঞতা কোনো দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি একটি শাসন-ব্যবস্থার ব্যর্থতার দলিল। এক হিসেবে দেখা যায়, ২০০১-০৬ এ ১০০তে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোর ছিলো ২০, যেখানে হাজারো সমালোচনা সত্ত্বেও ২০০৯-২০২৪ সময়কালে সর্বনিম্ন স্কোর ছিলো ২০। ওই ২০০১-০৬ সময়ে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই শতাংশ কমে যায়। এই দেড় দুই শতাংশ যদি সেসময়ের প্রবৃদ্ধিতে যোগ হতো তবে এটি আট শতাংশ ছাড়িয়ে যেতো। অর্থাৎ রাষ্ট্র শুধু নৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, অর্থনৈতিকভাবেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ে। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত সংকেত।

এই জায়গা থেকে তুলনামূলক বাস্তবতা বোঝা জরুরি। ২০০৯–২০২৪ সময়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের ডেলিভারি সক্ষমতা যে স্কেলে পৌঁছেছে, সেটি একটি কঠিন বেসলাইন তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ডেটা অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি পার ক্যাপিটা ২০২৪ সালে প্রায় ২,৬০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। দুই দশক আগে এই সূচক ছিল কয়েকশ ডলারের স্তরে। একই সময়ে সামগ্রিক জিডিপি ভলিউম প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এর অর্থ এই নয় যে সবকিছু নিখুঁত ছিল; এর অর্থ হলো মানুষের আয়-সামর্থ্য, বাজারের আকার এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্কেল উল্লেখযোগ্যভাবে বদলেছে।

বিদ্যুৎ খাতে তুলনাটি আরও স্পষ্ট। ২০০৯ সালে গ্রিডভিত্তিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের নিচে; ২০২২–২৩ অর্থবছরে তা পঁচিশ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। নীতির মান, জ্বালানি মিশ্রণ বা ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্মম—শিল্প, নগর ও সেবা খাতে অব্যবস্থার মূল কারন হিসেবে মানুষ তখন দূর্নীতিকেই দেখেছিলো। খালেদা জিয়া তাঁর প্রশাসনিক ও নৈতিক দৃঢ় অবস্থান কাজে লাগিয়ে তাঁর ঘরের ও বাইরে থাকা দূর্নীতির সব ডালপালা উচ্ছেদে ব্যবস্থা নিতে পারতেন। এটি তিনি করেননি কোটারী স্বার্থেই।

ভৌত অবকাঠামোতেও একই বাস্তবতা। পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংযোগে একটি গুণগত পরিবর্তনের সিগন্যাল দিয়েছে। ঢাকায় মেট্রোরেল চালু হওয়া নগর পরিবহনে সক্ষমতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এগুলো প্রতীকী সাফল্য নয়; এগুলো রাষ্ট্রের স্কেলড ডেলিভারির প্রমাণ। খালেদা জিয়ার সময় যমুনা সেতুর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়েছিলো, কিন্তু সেখানেও দূর্নীতিজনিত অব্যবস্থার কারনে এটি সুফল ঘরে তোলা যায়নি।

এই যে দূর্নীতি নিয়ে এত কথা এর পেছনে ছিলো খালেদা জিয়ার শাসনামলের প্রতিষ্ঠিত এক ধরনের দ্বৈত ব্যবস্থা। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যে শাসনব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল, সেটিকে কেবল একটি নির্বাচিত জনবান্ধব সরকারব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বাস্তবে রাষ্ট্র তখন এক ধরনের দ্বৈত ক্ষমতা কাঠামোতে পরিচালিত হচ্ছিল। সংবিধানিক নির্বাহী ক্ষমতা ছিল সরকারের হাতে, কিন্তু নীতিনির্ধারণ, নিয়োগ, টেন্ডার, লাইসেন্স ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বহু সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হতো একটি অঘোষিত কেন্দ্র থেকে যেটিকে বলা হতো হাওয়া ভবন; তাঁর পুত্র এই ভবনের নিয়ন্ত্রনে ছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ছিল রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিকীকরণ—যেখানে আইন ও প্রক্রিয়ার বদলে ব্যক্তিগত নৈকট্য শাসনের মুদ্রা হয়ে ওঠে। ম্যাক্স ওয়েবারের “Rule of Law”–এর জায়গা নেয় “Rule by clique”। এটি কেবল দুর্নীতির যুগ নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রের নিয়ম ভেঙে রাষ্ট্র চালানোর সময়। খালেদা জিয়ার দোষ ছিলো এই যে, তিনি হাওয়া ভবনের এই কালগ্রাসী কর্মকান্ডকে ঠেকানোর কোন উদ্যোগ নেননি; বরং তিনি হাওয়া ভবন দ্বারা আদিষ্ট হয়েই প্রশাসন চালনা করতেন বলে শোনা যায়।

এবার আসা যাক বিএনপি’র জামাতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতির বিষয়টিতে। এই জোট রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি ছিল আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিযোগিতা (Outbidding Dynamics), যেখানে জোট রাজনীতির ভেতরে দলগুলো নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে ক্রমাগত আরও কট্টর ভাষা ও অবস্থান বেছে নেয়। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল হয় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ও ঐতিহাসিক স্মৃতির ক্ষয়। জোটের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়, যেখানে ভাষা ও অবস্থান ক্রমাগত আরও কট্টর হয়ে ওঠে; এটি মূলত ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী ভাষ্যে ক্রমাগত “আরও কড়া” অবস্থান নেওয়ার চাপ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলেই মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন স্মৃতি নিয়ে তীর্যক বা সংশয়ী মন্তব্য রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘স্মৃতি-রাজনীতি’র এক বিপজ্জনক রূপ, যেখানে ইতিহাস আর ঐক্যের ভিত্তি না হয়ে ক্ষমতার প্রতিযোগিতার উপকরণে নেমে আসে।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক। খালেদা জিয়া ২০১৫ সালে (বাংলা ট্রিবিউন, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৫) প্রকাশ্য বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে “বিতর্ক আছে” বলে মন্তব্য করেন—যা তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত এ ধরনের বক্তব্য সমাজতত্ত্বের ভাষায় এক ধরনের স্মৃতি রাজনীতি (Memory Politics) যা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন স্মৃতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে রাজনৈতিক পক্ষগুলো নিজেদের “লেজিটিমেসি” পুনর্গঠন করতে চায়। কিন্তু এর সামাজিক মূল্য ভয়াবহ—কারণ মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় “মোরাল কমন গ্রাউন্ড”; সেটিকে “কন্ট্রোভার্সি” হিসেবে ফ্রেম করলে সমাজ এক ধরনের স্থায়ী মেরুকরণে আটকে যায়। খালেদা জিয়ার মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য কিংবা স্বাধীনতার ইতিহাসকে “কতগুলো কিতাব” বলে অবমূল্যায়নের প্রবণতা নিছক ব্যক্তিগত মত নয়; এগুলো ছিল স্মৃতি-রাজনীতির অংশ। রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্ত নৈতিক ভিত্তি—১৯৭১-এর সম্মিলিত স্মৃতি—যখন প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না; বরং সমাজ দীর্ঘস্থায়ী বিপজ্জনক মেরুকরণে আটকে যায়।

আরও গুরুতর অধ্যায় হলো সহিংস রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক ছায়া। ২০০১–২০০৬ সময়কালে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ছিল পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা। ২০০৫ সালে একদিনেই ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভাঙন স্পষ্ট করে দেয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা—যেখানে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি। ওই ঘটনার পর ‘জজ মিয়া’কে সামনে এনে তদন্তকে বিভ্রান্ত করার যে রাষ্ট্রীয় নাটক সাজানো হয়েছিল, তা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার সম্পূর্ণ বিপরীত উদাহরণ হয়ে আছে। খালেদা জিয়া নিজে সংসদে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তাঁর ভানিটি ব্যাগে বোম নিয়ে গিয়েছিলেন। এই মন্তব্য এটি মানুষ হিসেবে খালেদা জিয়ার উচ্চতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলো সেসময় এবং এখনো।

এখানে কার্যকর হয়ে ওঠে মূল–এজেন্ট ফাঁদ (Principal–Agent Trap)। রাজনৈতিক নেতৃত্ব (মূল) যখন মাঠপর্যায়ের ক্যাডার, নিরাপত্তা কাঠামো বা চরমপন্থি নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সেই এজেন্টরা ধীরে ধীরে স্বায়ত্তশাসিত হয়ে ওঠে। এর ফল হিসেবে সহিংসতা ও দমননীতি নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং রাষ্ট্রের আইনগত ন্যায্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল চাপে পড়লেও গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও বেশি। আমরা এর পরিণতি দেখেছি পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় এবং দলীয় ইতিহাসে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ে খালেদা জিয়ার দায় বড় কম ছিলোনা।

এই রাজনীতির ক্ষতি শুধু অতীতে সীমাবদ্ধ নয়—তার প্রমাণ বর্তমানেও স্পষ্ট। আজ বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক কার্যত ভেঙে পড়েছে। প্রকাশ্য বক্তব্য, মাঠপর্যায়ের সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক অবস্থানগত দূরত্ব দেখায়—একসময়কার কৌশলগত মিত্ররা এখন প্রতিদ্বন্দ্বী। আজ বিএনপি–জামায়াত সম্পর্কের ভাঙন আসলে সেই জোট রাজনীতির বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া (delayed backlash)—যেখানে একসময়কার কৌশলগত সুবিধা সময়ের ব্যবধানে রাজনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছে; যে শক্তিকে একসময় ক্ষমতার কনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, আজ সেই শক্তিই রাজনৈতিক বাজারে প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতা প্রমাণ করে—জামায়াতের সঙ্গে জোট শুধু রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; এটি বিএনপিকেও দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করেছে। দলটি একদিকে আন্তর্জাতিক সমর্থন হারিয়েছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে এমন শক্তিকে রাজনৈতিক জায়গা দিয়েছে যারা আজ তারই সাংগঠনিক ও আদর্শিক পরিসর সংকুচিত করছে। এই জায়গায় খালেদা জিয়ার দায় বড় কম নয়।

তবু খালেদা জিয়াকে স্মরণ করতে গিয়ে একরৈখিক সিদ্ধান্ত টানা হবে ইতিহাসের প্রতি অবিচার। তিনি ছিলেন একাধারে সংগ্রামী, দৃঢ়চেতা ও জনপ্রিয় নেত্রী; আবার একই সঙ্গে ছিলেন এমন এক শাসক, যার আমলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, নিরাপত্তা কাঠামো এবং ঐতিহাসিক স্মৃতি গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের রাজনীতির সেই দ্বন্দ্বকে ধারণ করে—যেখানে গণতন্ত্রের ভাষা উচ্চারিত হয়, কিন্তু ক্ষমতার প্রয়োগে তার সীমা বারবার অতিক্রম করা হয়।

আজ তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে সবচেয়ে সৎ অবস্থান হবে এই দ্বৈত সত্যকে একসাথে স্বীকার করা। শোক মানে ইতিহাস ভুলে যাওয়া নয়; শোক মানে দায়িত্বশীল স্মরণ। খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার গৌরব ও গ্লানি, অর্জন ও ব্যর্থতার এক জটিল সমষ্টি। এই নির্মোহ স্বীকৃতিই হয়তো একজন রাজনৈতিক নেত্রীর প্রতি জাতির পক্ষ থেকে সবচেয়ে ন্যায্য শ্রদ্ধা—যেখানে শোক আছে, কিন্তু ইতিহাসের দায় এড়ানো নেই।

 

লেখক পরিচিতঃ
ডঃ শ্যামল দাস
অধ্যাপক,
হোমল্যান্ড সিকিওরিটি, এলিজাবেথ সিটি স্টেট ইউনিভার্সিটি,
নর্থ ক্যারোলাইনা, ইউএসএ।

 

 

Visited 26 times, 1 visit(s) today