❐ শেখ হাসিনা
বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ ও উদার মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ। কিন্তু দেশটি এখন ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শাসনামলে মাত্র ১৫ বছরে দেশটি কোথা থেকে উঠে এসে বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ সরকার মাত্র এক বছরের মধ্যে সেই অর্জনগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নিহত অন্যান্য জাতীয় নেতা এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদ—তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। পাকিস্তানি বাহিনীর দখলদারত্ব থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে যারা সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছিলেন, তাঁরাও গভীর শ্রদ্ধার দাবিদার।
বাংলাদেশ বিপুল রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও স্বাধীনতার পর তার গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নের পথ মসৃণ ছিল না। বরং সেই পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমি আমার পুরো পরিবারকে হারাই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমার মা, আমার তিন ভাই এবং দুই ভাইয়ের স্ত্রীসহ পরিবারের মোট ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আমি ও আমার বোন তখন জার্মানিতে থাকায় এই হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যাই।
১৯৭৫ সালের পর আমরা দুই বোন ছয় বছর নির্বাসনে ছিলাম। ১৯৮১ সালে আমি যখন দেশে ফিরে আসি, তখন আমার পরিবারের সব হত্যাকারী বাংলাদেশে উপস্থিত ছিল এবং তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তাদের বিচারের দাবি জানানোরও কোনো অধিকার ছিল না। সব যুদ্ধাপরাধীকেও কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতেই ১৯৮১ সালে আমি দেশে ফিরে আসি মানুষের সেবা করার জন্য। আমার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আমাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করেছিল। আমি সভাপতি হতে প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু এটি ছিল আমার দল ও দেশের মানুষের প্রত্যাশা। আমার বাবা ও পরিবারের সদস্যরা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা আমার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি সামরিক স্বৈরশাসকদের হাতে শাসিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন হয়নি; বরং অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। সেটিই ছিল তখনকার বাস্তবতা।
তাই মানুষের জন্য গণতন্ত্র, আঞ্চলিক সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক মুক্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল লক্ষ্য। এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্যও। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে একটি দারিদ্র্যমুক্ত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে।
আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, গণতন্ত্র ও সমান নাগরিক অধিকারে বিশ্বাস করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে সব মানুষের আবাসভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন— মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীসহ প্রত্যেক নাগরিকের জন্য।
২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে। মানুষের সহায়তা করাই ছিল সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো হয় এবং বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ। মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের জন্য কিছু করা।
২০০১ সালে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট এবং সাক্ষরতার হার বেড়ে হয়েছিল ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যান্য আর্থসামাজিক সূচকেও বড় ধরনের উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করতে পারেনি।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস ধর্মীয় উগ্রবাদের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। হরকাতুল জিহাদ, জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সেখানে জায়গা, আশ্রয় ও সাহস পেয়েছিল। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
আট বছর পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের রায়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে। তখন সন্ত্রাস দমনকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২০০৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়। সন্ত্রাসে অর্থায়ন, অর্থপাচার, জঙ্গি নিয়োগ এবং উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করা হয়। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি), অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ (বিএফআইইউ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয় কাঠামো তৈরি করা হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
ধর্মীয় আলেম, শিক্ষক, পরিবার, তরুণ ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে কাজ করা হয়। এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—শুধু শক্তি প্রয়োগ করে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা যায় না। এর পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা, ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বিকল্প ব্যাখ্যা, অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, সাইবার নজরদারি এবং সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থাও প্রয়োজন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে প্রবেশ করে। কোটা সংস্কারের দাবিকে সামনে রেখে মুহাম্মদ ইউনূসের পরিকল্পিত আন্দোলনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। উগ্রবাদীদের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, সংগঠক ও সুবিধাভোগী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এসব সন্ত্রাসী ৪৬০টি পুলিশ স্টেশন পুড়িয়ে দেয়। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পুলিশ সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং ফ্লাইওভারে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
কারাগারেও হামলা চালানো হয়। সাজাপ্রাপ্ত ও অভিযুক্ত জঙ্গিরা পালিয়ে যায় অথবা জামিনে মুক্তি পায়। নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিযবুত তাহরীর, হরকাতুল জিহাদ এবং জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের নেতাসহ বহু সন্ত্রাসী, হত্যাকারী ও কারাবন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়।
হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, আহমদিয়া ও সুফি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মাজার-দরগাহসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ মানুষও রেহাই পায়নি। এটি ছিল বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর সরাসরি আঘাত।
উগ্রবাদী নেতারা আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসতে শুরু করেন। তাদের যুক্তি ছিল নির্মম—লাশ তৈরি করো, ক্ষোভ তৈরি করো, তাহলেই সরকার পড়ে যাবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তারেক রহমান ও জামায়াত সেই লক্ষ্যেই আন্দোলন চালিয়েছিলেন। এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না; বরং অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি অভিযান ছিল।
১৮ই জুলাই প্রতিটি মৃত্যু, প্রতিটি গুলি ছোড়া, প্রতিটি সহিংস ঘটনা এবং অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে তদন্ত করতে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ড. ইউনূস ও তাঁর সরকার যদি সত্যিই বিচার চাইতেন, তাহলে সেই তদন্ত কেন স্থগিত করা হলো? তারা কেন একটি স্বাধীন তদন্তকে ভয় পেলেন?
যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সুরক্ষা দিয়েছে। তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এই দায়মুক্তিই অনেক সত্য প্রকাশ করে। তারা যদি কোনো অপরাধ না করত, তাহলে তাদের দায়মুক্তির প্রয়োজন কেন হতো? তাদের সুরক্ষা দেওয়ার ঘটনাই প্রমাণ করে প্রকৃত হত্যাকারী কারা ছিল। তারেক রহমান তাঁর পূর্বসূরি যে কাজ শুরু করেছিলেন, সেটিই চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছেন।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দেশে আর কোনো আইনশৃঙ্খলা নেই। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়, হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে নেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতির ওপর দা, চাইনিজ কুড়াল, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয় এবং তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।
যে দেশে আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মীদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে, গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়েছে—সেখানে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নারী ও কিশোরীরাও ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে যে দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে ২০২১ সালে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের যোগ্যতা অর্জন করেছিল, সেই দেশের মানুষের জীবনেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছিল। দারিদ্র্যের হার কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। মানুষ তুলনামূলক শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির মধ্যে জীবনযাপন করছিল।
দুঃখজনকভাবে, গত দুই বছরে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে এবং আগের অর্জনগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। দারিদ্র্য বাড়ছে। এখন মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ঘরে কিংবা রাস্তায় কোথাও মানুষ নিরাপদ বোধ করছে না।
কিন্তু যারা ক্ষমতায় রয়েছে, তারা ক্ষমতা উপভোগ করছে, অর্থ উপার্জন করছে এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশার প্রতি তাদের কোনো নজর নেই। এমনকি টিকা না পাওয়ার কারণে শত শত শিশুর মৃত্যুও হয়েছে।
বার্তাটি খুবই পরিষ্কার। উগ্রবাদ, সহিংসতা কিংবা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি ধ্বংস করে দেশকে নতুন করে গড়ার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে হবে গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন, ধর্মীয় সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে।
একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং গোটা বিশ্বের জন্যই ভালো। একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।







