অজয় বাঙালী
ঢাকায় তীব্র গ্যাস সংকট, কৃষকের সারের সংকটে ফসল উৎপাদন ব্যহত, উত্তরাঞ্চলে শীতে শত শত মানুষের মৃত্যু এবং সারাদেশে ছাত্রলীগের সাবেক-বর্তমান নেতাকর্মীর প্রতি সহিংসতা চলমান অবস্থায় ঘটনার মধ্যেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে ছাত্রলীগে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা, ইউনূসীয় শাসনামলে ছাত্রলীগের কর্মী ও পরিবারের প্রতি নিপীড়নের ক্ষোভ প্রকাশ করে বর্তমান ও সাবেক নেতৃত্বকে নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে কিছু সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেন।
তবে ওই অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান অন্য নেতৃবৃন্দ দেশের চলমান সংকট ও অনিয়মের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ কীভাবে গড়ে তোলা যায়—নিজেদের বক্তব্যে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা না থাকায় সংগঠনটির তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
রবিবার বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে সংগঠনটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের সঞ্চালনায় আয়োজিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতারা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, মাহবুবুল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, সুজিত রায় নন্দী, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আমিনুল ইসলাম, বিপ্লব বড়ুয়া, অসীম কুমার উকিল ও সেলিম মাহমুদ।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম, লিয়াকত শিকদার, মাহমুদ হাসান রিপন, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন, বদিউজ্জামান সোহাগ, সাইফুর রহমান সোহাগ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, গোলাম রব্বানী, এসএম জাকির হোসেন, লেখক ভট্টচার্য বক্তব্য দেন।
শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ছাত্রলীগের ওপর দমন–পীড়নের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং আন্দোলন–সংগ্রামে নিহত ছাত্রলীগ কর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
ছাত্রলীগের সাবেক-বর্তমান নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হাজার হাজার ছাত্রলীগ কর্মীকে বিনা অপরাধে কারাগারে রাখা হয়েছে এবং শতাধিক কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ কর্মীদের বাড়িতে না পেয়ে তাদের বাবা–মা ও স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে, যা তাঁর ভাষায় ছিল কল্পনারও বাইরে।
শেখ হাসিনা ছাত্রলীগ কর্মীদের হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান এবং বলেন, এসব ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা যায়।
তবে শেখ হাসিনা ছাড়া কোন সাবেক ও বর্তমান নারী নেত্রীকে এ অনুষ্ঠানে বক্তার তালিকায় না রাখায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
আওয়ামী লীগের পক্ষে টকশো হোস্ট করা আফসানা কিশোয়ার লোচন বলেন, ‘একজন নারী নেত্রীও নেই সেই ভার্চুয়াল মিটিংয়ে, ২৪-এর এনার্কি কিন্তু জামায়া/ত শিবি/র সফলই করেছে নারীদের সহায়তায়’।
তবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অধিকাংশ বক্তৃতায় অতীত স্মরণ ও শেখ হাসিনার প্রশংসা ছাড়া বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে কার্যকর কোনো আলোচনা হয়নি। ঢাকায় তীব্র গ্যাস সংকট, সার ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে শীতে শত শত মানুষের মৃত্যু, মব সহিংসতা—এসব ইস্যুতে জনমত কীভাবে গড়ে তোলা হবে, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি বলে অভিযোগ তাঁদের।
অনুষ্ঠানটি নিয়ে ব্যারিস্টার জাকির হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করে বলেন, প্রায় ৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিটের এই অনুষ্ঠানের প্রায় ৮০ শতাংশ সময়ই অপ্রয়োজনীয় ও চর্বিত চর্বণ ছিল।
তাঁর ভাষায়, ভূমি বাস্তবতা কেউ তুলে ধরতে পারেননি। বছরের প্রথম দিনে সরকার সব শিক্ষার্থীকে বই দিতে না পারার ব্যর্থতার বিষয়টিও আলোচনায় আসেনি। তিনি বলেন, মাত্র ২০ শতাংশ আলোচনা ছিল ইতিবাচক।
ব্যারিস্টার জাকির হোসেন আরও বলেন, ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রশিবিরের প্রভাব বাড়লেও নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা বা কর্মসূচির কথা কেউ বলেননি। অতীতের ভুল–ভ্রান্তি, পুনর্মিলন বা পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির বিষয়েও কোনো আলোচনা হয়নি।
তাঁর অভিযোগ, যে সিন্ডিকেটের কারণে ছাত্রলীগের ভেতরে শিবির–ঘনিষ্ঠদের আধিপত্য তৈরি হয়েছে, সে বিষয়েও কেউ কথা বলেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তৃণমূল নেতা বলেন, সার্টিফিকেট ও চাকরি হারানো বর্তমান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। তাঁরা জানান, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হলেও তাদের পাশে দাঁড়ানোর কোনো সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি।
বিডি ডাইজেস্টের পরিচালক তনয় ইমরোজ বলেন, পুরো অনুষ্ঠানটি তিনি দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, ২০ থেকে ২৫ জন নেতা গড়ে পাঁচ–ছয় মিনিট করে বক্তব্য দিয়েছেন। বক্তৃতার শুরুতে স্মরণ এবং শেষভাগে শেখ হাসিনার প্রশংসায় সময় কেটেছে। কৃষক, শ্রমিক কিংবা মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যার কথা একজনও উচ্চারণ করেননি।
বাস্তবতা-বর্জিত এসব বক্তব্যের কারণে জনগণের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সব প্রজন্মই চায় রাজনীতিবিদরা জনসম্পৃক্ত থাকুক এবং মানুষের বাস্তব সমস্যার কথা বলুক।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় দেখছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক কর্মী ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অমি রহমান পিয়াল।
তিনি বলেন, আদর্শের জায়গায় তোষামোদ ও আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যখন তেলবাজি যোগ্যতার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন লড়াকু নেতৃত্ব তৈরি হয় না, বরং নতজানু মানসিকতা গড়ে ওঠে। এতে সংগঠনের শিরদাঁড়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, দুঃসময় থেকে উত্তরণের কোনো সুস্পষ্ট সুপারিশ বা কর্মপরিকল্পনা ছাড়াই বক্তৃতাগুলো হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সহিংসতার মুখে অসহায় অবস্থায় থাকলেও তাঁদের সংগঠিত করার কিংবা পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান শোনা যায়নি।
তৃণমূলের ত্যাগ ও আবেগকে ব্যবহার করে নেতৃত্ব তৈরি হলেও সেই তৃণমূল আজও উপেক্ষিত বলে অভিযোগ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গবেষক ।
অনুষ্ঠান শেষে তৃণমূল পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে—দেশের চলমান সংকট, অনিয়ম ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ কীভাবে গড়ে তোলা হবে, ছাত্রলীগ সেই প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট উত্তর দিতে পেরেছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকায় ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধুমাত্র সাবেক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী বর্তমান ও সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীদের দুঃখ-দূর্দশা নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন, কিছু পরামর্শও দেন। যেটা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রশংসা অর্জন করেছে।
