গুম কমিশনের প্রতিবেদন: আওয়ামী লীগ আমলে লক্ষাধিক গুম ও ৬০ হাজার খুনের কথিত অভিযোগে নাটকীয় মোড়!

গুম কমিশনের প্রতিবেদন: আওয়ামী লীগ আমলে লক্ষাধিক গুম ও ৬০ হাজার খুনের কথিত অভিযোগে নাটকীয় মোড়!
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস’ গতকাল,  ৪ঠা জানুয়ারি বিকালে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০০৯-২০২৪) বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততা ছিল।

কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, এসব ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, কমিশনে মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর ১,৫৬৯টি অভিযোগকে সংজ্ঞানুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে। গুমের শিকার যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের ৭৫ শতাংশ জামায়াত-ইসলামী ও শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের।

অন্যদিকে, যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি-সংশ্লিষ্ট এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের আমলে হাজার হাজার গুম ও হত্যার যে অভিযোগ উঠেছিল, তার সত্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিগত বছরগুলোতে বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াত-ইসলামী লাখ লাখ নেতাকর্মীর গুমের অভিযোগ করে আসছিল। কিন্তু কমিশনের যাচাইয়ে মাত্র ১,৫৬৯টি অভিযোগ গুম হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যুর প্রমাণিত ঘটনা মাত্র ২৮৭টি। এছাড়া, প্রায় ২০ শতাংশ অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংখ্যা আগের অভিযোগগুলোর সঙ্গে মিলছে না। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপি-সংশ্লিষ্ট গুমের অভিযোগ মাত্র ২২-৬৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা মোট সংখ্যায় প্রায় ৩৪৫ জনের মতো। অথচ বিগত ১৫ বছরে বিএনপি বারবার লাখ লাখ গুমের কথা বলে প্রচারণা চালিয়েছে। একইভাবে, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ১,১৭৬ জনকে গুমের শিকার বলা হলেও, তাদের দলও হাজার হাজার গুমের অভিযোগ করে আসছিল।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত অনেকে জীবিত ফিরে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, এরা আসলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ছিল কি না। অতীতে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের ঘটনায় ‘অধিকার’ নামক এনজিওর প্রকাশিত মৃত্যুর তালিকায় অনেকের নাম পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় বসবাস বা পরে ফিরে আসার ঘটনা দেখা গেছে। একই অবস্থা দেখা গেছে “জুলাই শহিদ” তালিকার ক্ষেত্রে, যা ২ হাজার মৃত্যুর সংখ্যা থেকে ৭/৮শ আশে পাশে এসে ঠেকেছে, যেখানে এখনো অনেক আসংঙ্গতি রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আওয়ামীলীগ আমলে জঙ্গি দমনে বিশেষ অভিযানে বান্দবনের পাহাড়ে বা পার্বত্য চট্টগ্রামে দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালায়ে বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণরত জঙ্গি ও বিচ্ছন্নতবাদীদের গ্রেপ্তার করে র‍্যাব ও বিভিন্ন টাস্কফোর্স। যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিল র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) কর্তৃক ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র ১৭ সদস্যসহ ২০ জনকে গ্রেপ্তার  , যারা সকলেই ৫ই আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে ছাড়া পেয়ে যায়। এরমধ্যে কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ৩ সদস্যও ছিল।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ফ্রান্সে ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও সহিংসতা, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে ধর্মীয় সংগঠনগুলোর ফরাসী দূতাবাস ঘেরাও এর সহিংস আন্দোলন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রতিবাদে সহিংস অবস্থান, হেফাজতের ভাষ্কর্যবিরোধী আক্রমণাত্মক কর্মসূচি, সোনারগাঁ রিসোর্টে ৫০১ কান্ডসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের নিরপত্তা ও জানমাল রক্ষায় অভিযান চালানো হয় এবং ধরপাকড় চলে। সেই আটককৃতরাই বিগত ১৭ মাসে গুমের শিকার হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে, এবং এদের তথ্যের ভিত্তিতে গুম করার অভিযোগে উল্টো আটক করা হয়েছে বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তাকে।

গুম কমিশনে স্বাক্ষ্যদাতা অনেকেই ফিরে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বোমা তৈরিসহ বিভিন্ন বিচ্ছন্ন উগ্রবাদী হামলায় জড়িয়েছে। এই সংক্রান্ত বিডিডাইজেস্ট এর বিশেষ প্রতিবেদনঃ

গুম কমিশনে সাক্ষ্যদাতা জঙ্গিরাই আবার বোমা বানাচ্ছে, যাদের সাক্ষ্যে জঙ্গিবিরোধী পুলিশ কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার

এছাড়া জামায়াত-শিবিরের কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তরের প্রবণতা দেখে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে, হাজার হাজার গুমের অভিযোগ থেকে ১,১৭৬ জনে এসে ঠেকা সংখ্যাটাই বা কতটা বিশ্বাসযোগ্য।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ৬০ হাজার হত্যা, বছরে গড়ে ৪ হাজার রাজনৈতিক কর্মী হত্যার পুলিশি পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছিল। ১৫ বছরে ২৫ লক্ষ কোটি টাকা পাচার এর আজগুবি তত্ত্ব প্রচার করা হয়েছে “দুর্নীতির শ্বেতপত্র” নামে এক ফরমায়েশি এবং প্রচুর আসংগতি ও ভুল তথ্যে পরিপূর্ন এক প্রতিবেদনে।

২৬ লক্ষ ভারতীয়ের চাকরির মতো অভিযোগ তোলা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। এসব ইস্যুকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালিয়ে জনমতকে গুজব, অসত্য, মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্ররোচিত করা হয়, যা শেখ হাসিনার সরকারের পতনে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ১৭ মাস পরও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

গুমের ক্ষেত্রেও হাজার হাজারের অভিযোগ শতকে নেমে আসায় অনেকে এগুলোকে অতিরঞ্জিত বা রাজনৈতিক প্রচারণা বলে মনে করছেন। প্রধান উপদেষ্টা ১৫০০ জন গুমের তথ্যে যারপরনাই খুশি হয়ে এই প্রতিবেদনকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এর সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রতিবেদন রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত অভিযোগগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর প্রয়োজন।

Visited 77 times, 1 visit(s) today