নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইকে ঘিরে বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন বিভিন্ন জেলায় জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীদের নানাভাবে বাধা দিয়েছে। মব করে মনোনয়ন বাতিলও করিয়েছে তারা। এতে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দলটির প্রার্থীরা।
চট্টগ্রামে জাপার একাংশের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্রস্তাবককে অপহরণের অভিযোগও করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার চট্টগ্রাম-৫ আসনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। এর আগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে তার বিপক্ষে স্লোগান ও হট্টগোল করে জুলাইযোদ্ধা নামের উগ্রবাদীরা তারা মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানায়। যাচাই-বাছাই শেষে দলীয় কাগজপত্রে অসংগতি পাওয়ার কথা জানিয়ে রিটার্নিং অফিসার তার মনোনয়ন বাতিল করেন। মব করে এই মনোনয়ন বাতিল করানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় পার্টি।
এর আগে শুক্রবার রংপুরে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন রংপুর-৪ আসনের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই চলাকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জাপার এক প্রার্থীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানান। তবে জেলা প্রশাসক অভিযোগ আমলে না নিয়ে জাপা প্রার্থী মাহবুবার রহমানের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন। এতে উপস্থিত জাপা নেতাকর্মীরা উল্লাস প্রকাশ করেন। এ সময় আখতার হোসেনের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে কার্যালয় ত্যাগ করেন।
নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী, গত ৩০শে ডিসেম্বর থেকে রিটার্নিং অফিসাররা মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই শুরু করেন, যা আজ রোববার শেষ হওয়ার কথা। তবে এ সময় চট্টগ্রাম, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জাপা প্রার্থীদের বাধা দেওয়া, হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে। জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে ২২৪টি আসনে এবং দলটির অন্য অংশের মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে ৫২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
জাপা প্রার্থীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে। তবে রিটার্নিং অফিসারদের দাবি, হলফনামায় তথ্যের গরমিল, ঋণখেলাপি থাকা, দলীয় প্রধানের স্বাক্ষরের অসংগতি ও অন্যান্য ত্রুটির কারণেই এসব মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় এখনো চূড়ান্ত তালিকা পাওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম-২ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য পনির উদ্দিন, বগুড়া–২ আসনে শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, নীলফামারী-৩ আসনে মো. রোহান চৌধুরী, রংপুর–-৪ আসনে জাপার (আনিস–ল রুহুল) প্রার্থী মো. আবদুস ছালাম, রংপুর-১ আসনে মঞ্জুর আলী, খুলনা-৫ আসনে শামীম আরা পারভীন (ইয়াসিন), খুলনা-৬ আসনে মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর, গাইবান্ধ-১ আসনে মাহফুজুল হক সরকার, নরসিংদী-২ আসনে রফিকুল আলম সেলিম, সুনামগঞ্জ-৫ আসনে জাহাঙ্গীর আলমসহ অন্তত ২৪ জন জাপা প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাপার একাংশের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
গতকাল রাজধানীর গুলশানে নিজের বাসভবনে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মনোনয়ন বাছাইয়ে অংশ নিতে গেলে তার প্রস্তাবক, সমর্থক ও দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মীর হেলালের সমর্থকরা বাধা ও হয়রানি করে। বিষয়টি পুলিশকে জানালে পুলিশ তাদের কার্যালয়ে প্রবেশে সহায়তা করে।
কিন্তু পুলিশ চলে যাওয়ার পরই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে তার প্রস্তাবক ও সমর্থকদের অপহরণ করা হয়। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা ও সমান সুযোগের পরিবেশ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত না হলে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই জাপার কর্মী সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। গত ১৯শে ডিসেম্বর তার গ্রামের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং ২৯শে ডিসেম্বর মনোনয়ন জমার দিনেও হুমকি দেওয়া হয়। সর্বশেষ তার প্রস্তাবক ও সমর্থকদের অপহরণের ঘটনা ঘটল।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের পর দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা এখনো দৃশ্যমান নয়। এখন আরা উল্টো হচ্ছে।
জাপার মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জাপা চেয়ারম্যানের প্রস্তাবক ও সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক দলের সমান অধিকার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অসম্ভব।
সংবাদ সম্মেলনে জাপার কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশিদ, নির্বাহী চেয়ারম্যান মুজিবুল হক চুন্নু, কো চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, শাহিদুর রহমান টেপা, মোস্তফা আল মাহমুদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য মাসরুর মাওলা, মো. জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া, মো. আরিফুর রহমান খান, সরদার শাজাহান, ফখরুল আহসান ও শাহাজাদা নূরুল ইসলাম ওমর উপস্থিত ছিলেন।
