নিজস্ব প্রতিবেদক
চলতি জানুয়ারি মাসের জন্য সাড়ে ১২ কেজি (১২ কেজি) এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে সরকারি এই দামের কোনো প্রতিফলন বাজারে নেই। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও এই দামেও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
৪ঠা জানুয়ারি, রোববার সন্ধ্যায় বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন এই দাম ঘোষণা করেন। ঘোষণা অনুযায়ী, সন্ধ্যা ছয়টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।
একলাফে ৫৩ টাকা বাড়ল: সরবরাহ সংকট না কৃত্রিম অভাব—প্রশ্ন গ্রাহকদের
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর ২০২৫–এ ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। এর আগের মাসে দাম বেড়েছিল ৩৮ টাকা।
নতুন দর অনুযায়ী, মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১০৮ টাকা ৮৩ পয়সা। গত মাসে যা ছিল ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা। এক মাসে কেজিতে দাম বেড়েছে ৪ টাকা ৪২ পয়সা।
গ্রাহক ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, দাম বাড়ার আগে অনেক এলাকায় সিলিন্ডার উধাও হয়ে যায়। পরে দাম বাড়লে হঠাৎ করেই বাজারে সরবরাহ দেখা যায়। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফার অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষ করে শীত মৌসুমে রান্নার চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী মজুতদারি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি দাম কেবলই কাগজে-কলমে, বাজারে ভয়াবহ সংকট
সরকারি দাম ঘোষণার পরও বাস্তবে বাজারে এলপিজির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত এক মাস ধরে অনেক এলাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রতি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে গ্রাহকদের অভিযোগ।
ঢাকার মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক দোকানদার সরাসরি জানিয়ে দিচ্ছেন—সরকারি দামে গ্যাস নেই। কেউ কেউ আবার নির্ধারিত দামের কথা বললে গ্যাস দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
গৃহিণী সাবিনা খাতুন বলেন, “১২শ টাকার গ্যাস এখন ১৮শ টাকায়ও মিলছে না। দোকানে গেলে বলে গ্যাস নেই, পরে শুনি অন্য কাউকে বেশি দামে দিয়েছে।”
কেন বাড়তি দাম? বিইআরসির বক্তব্য
বাড়তি দামের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন পর্যায়ে তাঁরা নির্ধারিত দামেই পরিবেশকের কাছে বিক্রি করছেন। খুচরা পর্যায়ে যদি বাড়তি দামে বিক্রি হয়ে থাকে, সে বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, উৎপাদন পর্যায়ে বাড়তি দামের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে বিইআরসি অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, বিইআরসি প্রতি মাসে দাম ঘোষণা করলেও খুচরা বাজারে তার বাস্তব প্রয়োগ নেই। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকায় এলপিজির দাম কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
এক ভোক্তা অধিকারকর্মী বলেন, “সরকারি দাম আর বাজারদরের পার্থক্য যদি ৭০০–১০০০ টাকা হয়, তাহলে এটি স্পষ্টতই তদারকির ব্যর্থতা।”
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে গৃহস্থালি গ্রাহক
১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ না থাকায় শহর ও গ্রাম মিলিয়ে লাখো পরিবার এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাজারে সংকট ও বাড়তি দামের কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
মোহাম্মাদপুরের বাসিন্দা সুরভী জান্নাত বলেন, দাম নির্ধারণের পাশাপাশি যদি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খুচরা পর্যায়ে কঠোর নজরদারি না করা হয়, তাহলে এলপিজি খাতে এই ভোগান্তি আরও বাড়বে।
