প্রিসেট৭১
১৯৭২ সালের মে মাসের শেষদিন। খুলনার টুটপাড়া রোডে একটি বাসায় আত্মগোপনে আছেন সেলিম শাহনেওয়াজ ও তার ভালোবেসে বিয়ে করা স্ত্রী আলমতাজ বেগম ছবি। সেলিম শাহনেওয়াজ পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির বরিশাল-খুলনা এলাকার এরিয়ার কমাণ্ডার, কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য। পার্টিতে তার গোপন নাম ফজলু। আলমতাজ বেগম ছবিও পার্টি সদস্য। গোপন নাম মিনু অথবা দীপা। দুজনের কাছে অস্ত্র বলতে দুটি গুলিভরা রিভলবার এবং ৩টি হ্যান্ড গ্রেনেড।
ফজলু ও মিনু আত্মগোপনে-পুলিশের ভয়ে নয়, নিজেদের দলের প্রধান কমরেড সিরাজ সিকদার তাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষনা করেছেন। মুল অপরাধ, সিরাজ সিকদার এই বিয়ে মেনে নেননি।
বছর দশেক পর পার্টির পত্রিকায় আরেক কমরেড স্মৃতিচারণে লিখেন- “ফজলু ও মিনুর মধ্যকার তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক মানের বিরাট ব্যবধানের কারণে কেন্দ্রীয় কমিটি এই বিয়েতে অসম্মতি প্রদান করে। অনুরূপ ঘটনা সুলতানের বেলায়ও ঘটে। সেও চরম নিম্নমান সম্পন্ন প্রেমিকা সালমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব কেন্দ্রীয় কমিটির নিকট পেশ করে।একই যুক্তিতে তার আবেদনও নাকচ হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমতি না পাওয়ায় পর ফজলু আবোল-তাবোল কাজ কর্ম, পাগলামি শুরু করে,চরম হতাশ হয়। এ অবস্থায় তাকে বুঝানোর জন্য সভাপতি সিরাজ সিকদার খুলনা গিয়েছিলেন। খুলনায় ফজলু ঘর বন্ধ করে নিজের মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে বলে, বিয়ের অনুমতি না দিলে সে আত্মহত্যা করবে।এ অবস্থায় ফজলুসহ সভাপতি ঢাকায় ফেরেন”।
ফজলু ও সুলতানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, বিয়ের অনুমতি না পাওয়ায় তারা সিরাজ সিকদারের বিরুদ্ধে চক্র ও উপদলীয় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। অতএব তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যদিও সিরাজ সিকদার নিজে দুটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথম বিয়ে একজন কৃষক কণ্যাকে- শ্রেণিচ্যুত হবার আকাঙ্খা থেকে। পরে আবার বিয়ে করেন পার্টি কমরেড জাহানারা বেগমকে।
ফজলু ও মিনুর আত্মগোপনের বাসার দরজার কড়া নেড়ে উঠে ১৯৭২ সালের মে মাসের শেষদিন রাত আটটায়। ভাত রান্না করছিলেন মিনু। ফজলু সতর্ক হয়ে উঠেন। মিনু এগিয়ে গিয়ে দরজা একটু ফাঁক করে আগন্তুকদের দেখে নিশ্চিত হন। ফজলুর ছোটবেলার বন্ধু এবং সর্বহারা পার্টির সক্রিয় কর্মী রিজভি এবং নুরু। বন্ধুদের জড়িয়ে ধরলেন ফজলু। দুজনের খাবার চারজন মিলে খেলেন। এরপর রিজভি একটি চিঠি দিলেন ফজলুকে। ঝালকাঠি থেকে শিখা নামের আরেক কমরেড লিখেছেন, এখানে এক বাসায় প্রচুর অস্ত্র লুকানো আছে, তিনি গেলে পাবেন। প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হলেও অস্ত্রের প্রয়োজন ভেবে রাজি হন ফজলু। মিনুকে তার ভাইয়ের বাসা ঢাকায় চলে যাবার ব্যবস্থা করে দিয়ে বন্ধুদের সাথে ঝালকাঠির উদ্দেশ্যে খুলনা ত্যাগ করেন সেলিম শাহনেওয়াজ ওরফে ফজলু।
৩রা জুন সকালে দেখা গেলো সুগন্ধা নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছে সেলিম শাহনেওয়াজের লাশ। মারাত্মক সায়ানাইড মাখা ছুরির আঘাতে লাশের শরীর ক্ষতবিক্ষত। মাত্র ৩ ইঞ্চি ফলার এরকম ছুরি খাপে পুরে লকেটের মতো সবসময় গলায় ঝুলিয়ে রাখতো রিজভি, সেলিমের ছোটবেলার বন্ধু ও পার্টি কমরেড!
মিনু এই সংবাদ পাননি ততক্ষনাৎ। তিনি তখন চলে এসেছেন ঢাকায়, তার ভাই হুমায়ুন কবিরের কাছে। হুমায়ূন কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক, কবি ও বুদ্ধিজীবী। স্ত্রী সুলতানা রেবু, ছেলে সেতু ও মেয়ে খেয়াকে নিয়ে থাকতেন ইন্দিরা রোডের একটি বাড়িতে।তিনি নিজেও সর্বহারা পার্টির সাথে জড়িত কিন্তু সিরাজ সিকদারের সাথে মতবিরোধ চলছে। বোন এবং বোনের স্বামীর বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডই শুধু নয়, তাদের আরেক ভাই ফিরোজ কবিরের মৃত্যুর জন্যও তিনি সিরাজ সিকদারের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। কিশোর ফিরোজ কবির পেয়ারা বাগানে সিরাজ সিকদারের সাথে ছিলেন। যুদ্ধকৌশল নিয়ে মতবিরোধ থেকে তাকে বহিস্কার করেন সিকদার। পরে আগস্ট মাসে বরিশালে পাকিস্তান আর্মির হাতে ধরা পড়েন ফিরোজ। ফিরোজ কবিরকে গুলি করে হত্যা করে পাক আর্মি।
১৯৭২ সালের ৬ই জুন, সময় রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। হুমায়ুন কবির খুব ব্যস্ত ছিলেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কুসুমিত ইস্পাত’ প্রকাশনা নিয়ে। প্রচণ্ড গরমে ক্লান্তবিধ্বস্ত অবস্থায় হুমায়ুন বাড়ি ফিরে এলে পরিবারের অন্যরা রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এসময় খুব পরিচিত কেউ এসে ডাকেন তাকে। এতোই পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ যে, ঘর্মাক্ত রাতে খালি গায়ে বের হয়ে আসেন হুমায়ুন কবির। খালি গায়েই তিনি চলে যান তার সঙ্গে সামনের মাঠে। সেখানে অপেক্ষায় ছিলো অপর আততায়ী। সম্ভবতঃ সেই পেছন থেকে গুলি করে। আততায়ী দুজন সাইকেলে চড়ে চলে যায় নিরাপদে। রকাক্ত, নিথর কবির মৃতদেহ পড়ে থাকে মাঠে।
১৯৭৩ ও ৭৪ সালে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি ২৪টি থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাংক লুট করতে সক্ষম হয়। ১৬ই ডিসেম্বরকে বিজয় দিবসের বদলে ভারত কর্তৃক পূর্ব বাংলা দখলের ‘কালো দিবস’ আখ্যায়িত করে ১৯৭৩ সালের ১৬ই ডিসেম্বর হরতালের ডাক দেয় সর্বহারা পার্টি। ‘৭৪ সালে ১৬ই জুন আবার হরতাল ডাকে। হরতাল সফলের কর্মসূচী হিসেবে বোমা হামলা, খতম, রক্ষীবাহিনী-পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, পোস্ট অফিস, রেলস্টেশনে হামলা, রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং সড়কপথ অবরোধের ঘটনা ঘটায়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থিত তিতাস গ্যাসের সেন্টার মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেয়া।
১৬ই ডিসেম্বর ‘কালো দিবস’ হিসেবে ১৯৭৪ সালের ১৫ ও ১৬ই ডিসেম্বর- দুদিন আবার হরতাল আহ্বান করে সর্বহারা পার্টি। পল্টন ময়দানের জনসভায় এই হরতালকে সমর্থন জানান মওলানা ভাসানী। এই হরতালে আলোড়নমুলক ঘটনা ছিলো কয়েকটি পত্রিকা ও ম্যাগাজিন অফিসে বোমা হামলা, ঢাকার নাখালপাড়ায় রেললাইন মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেয়া; ময়মনসিংহ, নারায়নগঞ্জ,কুমিল্লা ও নরসিংদীতে রক্ষীবাহিনীর সাথে ব্যাপক গুলি বিনিময় এবং ফতুল্লায় নদীর ত্রিমোহনায় স্টিমার-লঞ্চ আটকে দেয়া।
সর্বহারা পার্টির দলিলে দাবী করা হয়- ‘৭৩ ও ‘৭৪ সালে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে তাদের ৪৬ জন ক্যাডার নিহত হন। বলাবাহুল্য- কমরেড সিরাজ সিকদারের সাথে মতবিরোধের অপরাধে কয়জন পার্টি সদস্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন সেই উল্লেখ দলিলে নেই। শ্রেণিশত্রু আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী খতম করা পার্টি এজেন্ডা হিসেবেই উল্লেখিত ছিলো। কতোজন শ্রেণিশত্রু খতম হয়েছিলো- দালিলিক না থাকলেও সংখ্যাটি একেবারে কম নয়।
চক্র, উপদলীয় ষড়যন্ত্র, শ্রেণিশত্রু ইত্যাদি নানা অভিধায় বহু মানুষ হত্যার পর ১লা জানুয়ারী ১৯৭৫, পুলিশের হাতে ধরা পড়েন সিরাজ সিকদার। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে মধ্যরাতে সাভারে নিয়ে যাবার পথে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে তাকে। সংবাদ প্রকাশিত হয়- অস্ত্র উদ্ধারে নিয়ে যাবার পথে গাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত সিরাজুল হক সিকদার।
এই হত্যাকাণ্ডকে বলা হয় বাংলাদেশের প্রথম “বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড”। কমরেড সিরাজ সিকদারের নির্দেশে সংগঠিত অগণিত হত্যাকে অবশ্য কিছু বলা হয়না। এসব হয়তো বিপ্লবের ক্যাজুয়ালিটি মাত্র।
