মতামত।। ভারতীয় মুসকানের হিজাবের জন্য পরাণ কাঁদলেও, দীপু দাসের বর্বরোচিত হত্যায় কেন নীরব বাংলাদেশের সুশীলরা?

মতামত।। ভারতীয় মুসকানের হিজাবের জন্য পরাণ কাঁদলেও, দীপু দাসের বর্বরোচিত হত্যায় কেন নীরব বাংলাদেশের সুশীলরা?
শেয়ার করুন

ভারতের মুসকান-এর হিজাব বিতর্কে ভারতবাসী তার পক্ষে দাঁড়ালেও, বাংলাদেশে কেন পুড়িয়ে হত্যা করা দীপু চন্দ্র দাসের পক্ষে প্রতিবাদ করার সাহস করছেন না সুশীল ও শিক্ষিত সমাজ?

– মৃণ্ময় সেন

২০২২ সালে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে হিজাব বিতর্ক একটি জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়। মুসকান খান নামে এক মুসলিম ছাত্রী কলেজে হিজাব পরে যাওয়ায় একদল হিন্দু ছাত্র তাকে উত্যক্ত করে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দেয়। মুসকান ভয় না পেয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে প্রতিবাদ করেন। এই ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর ভারতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিপুল সমর্থন পায় মুসকান। তার শিক্ষকরা, মানবাধিকার কর্মীরা, গণমাধ্যম এবং বলিউড তারকারা যেমন পূজা ভাট, কমল হাসান, অমিতাভ বচ্চন প্রমুখ তার পক্ষে সরব হন। অনেক হিন্দু নাগরিকও এটাকে ধর্মীয় উন্মাদনা হিসেবে দেখে মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থন করেন। বাংলাদেশেও মুসকানের হিজাব আর পর্দা করার অধিকারের পক্ষে সমর্থনের জোয়ার বয়ে যায়।

এই ঘটনা ভারতের গণতান্ত্রিক সমাজের একটি উজ্জ্বল দিক তুলে ধরে, যেখানে সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায় সংখ্যাগুরু সমাজের একাংশও এগিয়ে আসে।অথচ বাংলাদেশে ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়।

২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় দীপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু টেক্সটাইল শ্রমিককে মিথ্যা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব লিঞ্চিং করে হত্যা করা হয়। তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পর মৃতদেহ গাছে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ তদন্তে ধর্ম অবমাননার কোনো প্রমাণ পায়নি; পরবর্তীকালে জানা যায়, এটি কর্মক্ষেত্রে বিরোধ থেকে উদ্ভূত। এর কয়েকদিন পর ঝিনাইদহে গোবিন্দ বিশ্বাস নামে এক হিন্দু রিকশাচালককে হাতে লাল সুতো দেখে ‘ভারতের চর’ সন্দেহে মব পিটিয়ে আহত করে। এছাড়া শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪-২০২৫ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন বেড়েছে।

চট্টগ্রামের হাজারি গলি তে সেনাবাহিনীর প্লাটুন নামিয়ে সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের উপর রাতভর অত্যাচার চালানো হয়, নিরাপত্তার নামে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২,১৮৪টি হামলা হয়েছে, যার মধ্যে মন্দির ভাঙচুর, ঘরবাড়ি লুট, অগ্নিসংযোগ অন্তর্ভুক্ত। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও ২৫৮টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ধর্ষণ, মন্দিরে হামলা ইত্যাদি রয়েছে।

এই ঘটনাগুলোতে বিশ্বজুড়ে হিন্দু সম্প্রদায় ও মানবাধিকার কর্মীরা প্রতিবাদ করলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের নীরবতা চোখে পড়ার মতো। যারা একসময় মুসকানের অধিকার নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি ও পত্রিকায় সরব ছিলেন, তারা দীপু চন্দ্র দাসের বর্বর হত্যায় চুপ। সেভেন সিস্টার্স বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেয়া ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও এ বিষয়ে মুখ খোলেননি, যারা সংস্কার, অধিকার, সাম্য ও সম্প্রীতি’র বয়ান দিয়ে জনমানুষের প্রতারিত করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

 

দুই দেশের শিক্ষিত সমাজের পার্থক্য কোথায়?

ভারতে মুসকানের ঘটনায় সমর্থন এসেছে কারণ সেখানকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও সুশীল সমাজ তুলনামূলকভাবে স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়। হিন্দু সংখ্যাগুরু হলেও অনেকে ধর্মীয় উন্মাদনাকে প্রত্যাখ্যান করে সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায় দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে কি একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে?

শেখ হাসিনার পতনের পর ইসলামি উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বেড়েছে। বাংলাদেশের মিডিয়া টাইকুন প্রথম আলো, দ্যা ডেইলি স্টার সহ একাধিক মিদিয়া হাউজ আক্রন্ত হয়েছে এই উগ্রবাদীদের দ্বারা, দখল হয়েছে। সুশীল সমাজের নীরবতার কারণ হতে পারে:

  • ইসলামপন্থীদের ভয়: উগ্রবাদীদের হামলার ভয়ে অনেকে চুপ থাকেন।
  • রাজনৈতিক প্রভাব: হিন্দুদের প্রায়শই আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে দেখা হয়, ফলে তাদের উপর হামলাকে কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে দেখেন। প্রধান উপদেষ্টা নিজে বলেছেন “হিন্দুদের উপর অত্যাচার তার ধর্মের কারনে হচ্ছে না, আওয়ামীলীগ সম্পৃক্ততার কারনে হচ্ছে”, যা বলে তিনি আসলে এই মব সন্ত্রাসকে সমর্থন দিয়েছেন।
  • সামাজিক চাপ: সংখ্যাগুরু মুসলিম সমাজে সংখ্যালঘুর পক্ষে কথা বললে ‘ভারতপন্থী’ বা ‘অমুসলিম’ তকমা লাগার ভয়।
  • প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্বলতায় আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, ফলে প্রতিবাদ করলে নিরাপত্তার অভাব।

এই দ্বৈত মানদণ্ড সাম্য ও সম্প্রীতির কথা বলা সমাজের ভণ্ডামি তুলে ধরে। বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজকে এখন প্রশ্ন করতে হবে: মানবাধিকার কি শুধু নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য, নাকি সবার জন্য? দীপু চন্দ্র দাসের মতো ঘটনায় নীরবতা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সময় এসেছে সাহসী প্রতিবাদের, যাতে বাংলাদেশ আবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হয়ে উঠতে পারে।

 

Visited 21 times, 1 visit(s) today