মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে তেল, নিরাপত্তা ও সামরিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও, ধীরে ধীরে পানিই হয়ে উঠছে অঞ্চলের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কৌশলগত সম্পদ। ক্রমবর্ধমান জলস্বল্পতা, জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা একত্রে পানিকে এমন এক ইস্যুতে পরিণত করছে, যা আগামী দিনে নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
এই সংকটের বড় অংশই প্রকৃতির অনিবার্য পরিণতি নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা ভুল নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল। ইরানের মতো দেশে অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ, অদক্ষ নগর পরিকল্পনা, কৃষিতে পানির অপচয় এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে অনীহা জলব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। টানা কয়েক বছরের তীব্র খরার ফলে জলাধারগুলো বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে গেছে, এমনকি বড় শহরের বাসিন্দাদের স্থানান্তরের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। বহু বাঁধ কার্যত শুকিয়ে যাওয়ায় পানির ঘাটতি এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা।
একই ধরনের চিত্র দেখা যায় সিরিয়া ও ইরাকে, যেখানে খরা ও যুদ্ধ একে অপরকে শক্তিশালী করেছে। সিরিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী জলসংকট সামাজিক অস্থিরতাকে উসকে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে সহিংস দমন ও গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। যুদ্ধ চলাকালে পানিশোধনাগার ও পাম্পিং স্টেশন ধ্বংস হওয়ায় দেশটির জল অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। প্রতিবেশী ইরাকেও বছরের পর বছর সংঘাত, দুর্নীতি ও দুর্বল প্রশাসন পানির সংকটকে আরও গভীর করেছে, ফলে নদীনির্ভর একটি দেশ হয়েও সেখানে পানির নিরাপত্তা অনিশ্চিত।
উজানে অবস্থিত দেশগুলোর সিদ্ধান্ত ভাটির অঞ্চলের সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীতে বৃহৎ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ভাটির দেশগুলোতে পানির প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমেছে। আঞ্চলিক সমঝোতার কিছু প্রচেষ্টা থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদি আস্থার অভাবে এসব উদ্যোগ এখনও নাজুক।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল একটি ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে। সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পানি সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহার ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে দেশটি নিজের চাহিদা অনেকটাই পূরণ করতে পেরেছে। তবে এই সক্ষমতা কেবল প্রযুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; কূটনৈতিক চুক্তি ও সামরিক প্রভাবের মাধ্যমে আঞ্চলিক পানিসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণও এর অংশ। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি কখনো সহযোগিতার প্রতীক, আবার রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে তা চাপ সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত হয়।
জর্ডানের ক্ষেত্রে পানির প্রশ্নটি সরাসরি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। বিশ্বের অন্যতম জলস্বল্প এই দেশটি দীর্ঘদিন ভর্তুকির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে সামাজিক শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শরণার্থী প্রবাহে সেই ব্যবস্থা এখন আর টেকসই নয়। ভবিষ্যৎ সমাধানগুলো ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ, আর বাস্তবে দেশটি এখনও প্রতিবেশীদের পানিনীতির ওপর নির্ভরশীল।
ফিলিস্তিনিদের জন্য পানি সংকট রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গাজায় প্রধান জলাধার অতিরিক্ত ব্যবহার ও দূষণে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলেও গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদ যৌথভাবে ব্যবহৃত হয়, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য স্পষ্টভাবে একপাক্ষিক। ফলে পানির প্রবেশাধিকার সেখানে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ।
নীল নদের অববাহিকায় মিসরের অবস্থানও উদ্বেগজনক। মরুভূমিপ্রধান একটি দেশ হিসেবে মিসর তার প্রায় সব মিঠা পানির জন্য এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। উজানে বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এক দেশের জন্য উন্নয়নের প্রতীক হলেও, ভাটির দেশের জন্য তা অস্তিত্বগত হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। এতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সব সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও মরুকরণ পানির প্রাপ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়াচ্ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। যদি পানি কেবল জাতীয় স্বার্থ ও শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতায় বিশ্লেষকদের মতে, পানিকে আঞ্চলিক কূটনীতির কেন্দ্রে আনা ছাড়া বিকল্প নেই। যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা, ন্যায্য পানিবণ্টন চুক্তি, প্রযুক্তি বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ছাড়া এই নীরব সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে। অন্যথায়, পানি শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।
