তীব্র গ্যাস সংকটের দিকে দেশ

তীব্র গ্যাস সংকটের দিকে দেশ
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশ তীব্র গ্যাস সংকটের দিকে এগোচ্ছে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট মহলে। আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে চাপ বাড়বে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ মিলছে প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি মেটাতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে আমদানি পরিকল্পনায় চাপ তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজি বাংলাদেশের প্রধান ভরসা। সরবরাহপথে বিঘ্ন বা মূল্যবৃদ্ধি হলে তা সরাসরি দেশের জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

পেট্রোবাংলার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই মুহূর্তে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সমস্যা বাড়বে।” তিনি জানান, কিছু কার্গো নির্ধারিত সময়েই আসছে, তবে স্পট মার্কেটে এলএনজি কেনা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

শিল্প খাত ইতিমধ্যে প্রভাব অনুভব করছে। গ্যাসচাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে শিল্পমালিকেরা জানিয়েছেন। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও সিরামিক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস না থাকলে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হয়।

বিদ্যুৎ খাতেও চাপ বাড়ছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে বিকল্প হিসেবে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হয়, যা ব্যয়বহুল। এতে ভর্তুকির চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননের গতি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহচুক্তি শক্তিশালী করা এবং জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম, বিশেষ করে প্রথম আলো-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মধ্যে এলএনজি আমদানি ব্যয় বাড়লে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং অগ্রাধিকারভিত্তিতে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস বণ্টন করতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব গ্যাসসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার গতিপ্রকৃতির ওপর। তবে সংশ্লিষ্টদের সতর্কবার্তা—সংকট এড়াতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

Visited 7 times, 1 visit(s) today