ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলাগামী ও ভেনেজুয়েলা ত্যাগকারী নিষেধাজ্ঞাভুক্ত অয়েল ট্যাংকারে ‘পূর্ণ অবরোধ’

ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলাগামী ও ভেনেজুয়েলা ত্যাগকারী নিষেধাজ্ঞাভুক্ত অয়েল ট্যাংকারে ‘পূর্ণ অবরোধ’
শেয়ার করুন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ ও ভেনেজুয়েলা থেকে বেরিয়ে যাওয়া সব নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল ট্যাংকারের ওপর “সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক” অবরোধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন সম্পদ চুরি, সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার ও মানব পাচারের অভিযোগ তুলে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এই ঘোষণা আসে ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী একটি নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল ট্যাংকার জব্দ করার এক সপ্তাহ পর।

ট্রুথ সোশ্যাল–এ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, “আমাদের সম্পদ চুরি এবং সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার ও মানব পাচারসহ বহু কারণে ভেনেজুয়েলার শাসকগোষ্ঠীকে একটি ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুতরাং আজ আমি ভেনেজুয়েলায় যাতায়াতকারী সব নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল ট্যাংকারের ওপর সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক অবরোধের নির্দেশ দিচ্ছি।”

ভেনেজুয়েলার কড়া প্রতিক্রিয়া

ভেনেজুয়েলা সরকার এই অবরোধকে “ভয়াবহ হুমকি” এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।

এক বিবৃতিতে দেশটির সরকার জানায়, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানাই—এই অযৌক্তিক ও আগ্রাসী হুমকি প্রত্যাখ্যান করুন, যা আবারও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশ করে: একটি দেশের সম্পদ লুট করা।”

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য হলো “ভেনেজুয়েলার তেল, ভূমি ও খনিজ সম্পদ দখল করা—মিথ্যা ও অপপ্রচারের বিশাল প্রচারণার মাধ্যমে।”

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, যিনি ট্রাম্পের ঘোষণার আগেই এক জনসভায় বক্তব্য দেন, বলেন, “সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদী ডানপন্থীরা ভেনেজুয়েলাকে উপনিবেশে পরিণত করতে চায়, যাতে তারা আমাদের তেল, গ্যাস, স্বর্ণসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদ দখল করতে পারে। আমরা শপথ করেছি—আমাদের মাতৃভূমি রক্ষা করব, এবং ভেনেজুয়েলায় শান্তিই বিজয়ী হবে।”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখেও ভেনেজুয়েলা নিজেকে একটি “শক্তিশালী দেশ” হিসেবে প্রমাণ করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে মাদুরো অভিযোগ করেন, তার দেশ গত ২৫ সপ্তাহ ধরে “মনস্তাত্ত্বিক সন্ত্রাস থেকে শুরু করে তেল ট্যাংকারে জলদস্যু হামলা পর্যন্ত বহুমাত্রিক আগ্রাসন” মোকাবিলা করছে।

উত্তেজনার পেছনের প্রেক্ষাপট

বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুদের অধিকারী ভেনেজুয়েলা দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে এবং দীর্ঘদিন ধরেই তেল আয়ের ওপর দেশটির অর্থনীতি নির্ভরশীল।

ট্রাম্প তার পোস্টে বলেন, “দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নৌবহর দিয়ে ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। এটি আরও বড় হবে, এবং যতক্ষণ না তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে চুরি করা সব তেল, ভূমি ও অন্যান্য সম্পদ ফিরিয়ে দেবে, ততক্ষণ তাদের জন্য এই ধাক্কা অভূতপূর্ব হবে।”

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় জাহাজ লক্ষ্য করে চালানো একাধিক সামরিক অভিযানে বহু মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, শিগগিরই ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে স্থলভিত্তিক সামরিক হামলা শুরু হতে পারে। তার প্রশাসনের দাবি, এসব অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবেশ প্রতিরোধ করা হয়েছে।

তেল নিষেধাজ্ঞা ও ‘শ্যাডো ফ্লিট’

বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ৩০টিরও বেশি তেল ট্যাংকার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। গত সপ্তাহে একটি ট্যাংকার জব্দ হওয়ার পর কার্যত এক ধরনের অবরোধ তৈরি হয়েছে, যার ফলে কোটি কোটি ব্যারেল তেল বোঝাই জাহাজগুলো জব্দের ঝুঁকিতে ভেনেজুয়েলার জলসীমাতেই অবস্থান করছে।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সাইবার হামলা দেশটির তেল রপ্তানি আরও ব্যাহত করেছে।

২০১৭ সাল থেকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার পর মাদুরো সরকার অচিহ্নিত বা পতাকাবিহীন ট্যাংকার ব্যবহার করে গোপনে তেল রপ্তানি করে আসছে, যাকে ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলা বৈশ্বিক তেল বাজারে প্রবেশে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে এবং বড় ছাড়ে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার দৈনিক উৎপাদিত তেলের বড় অংশ বিদেশে রপ্তানি হয়। এর সিংহভাগ যায় চীনে, একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে এবং অবশিষ্ট অংশ কিউবায় সরবরাহ করা হয়।

অবরোধ কার্যকর করা নিয়ে অনিশ্চয়তা

আন্তর্জাতিক আইনে নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলো জাহাজকে তাদের জলসীমা ত্যাগ করতে বা বন্দরে প্রবেশে বাধা দিতে পারে। তবে খোলা সমুদ্রে জাহাজ জব্দের ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে এই নতুন অবরোধ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বর্তমানে ওই অঞ্চলে বিমানবাহী রণতরীসহ একাধিক মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, উভচর আক্রমণ জাহাজ ও সামুদ্রিক নজরদারি বিমান মোতায়েন রয়েছে।

তেলের দামে সম্ভাব্য প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি আরও কমে গেলেও বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ বর্তমানে ওপেকভুক্ত দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে বেশি তেল উৎপাদন করছে।

তবে ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে সামান্য ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি বাজারেও তেলের ফিউচার দামে সীমিত বৃদ্ধি দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবরোধের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রভাব পড়তে পারে চীনের ওপর, কারণ ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর দেশটির নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে বেশি।

Visited 7 times, 1 visit(s) today