বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
বাংলাদেশ পুলিশের নতুন ইউনিফর্মের কাপড় সরবরাহে প্রায় ১৪১ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে নোমান গ্রুপ। এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশের জন্য বুট ও বিভিন্ন ধরনের জুতা সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছে ফ্রেন্ডস ট্রেডিং কর্পোরেশন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ট্যানারি, জুতা উৎপাদন কারখানা কিংবা প্রয়োজনীয় বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। প্রতিষ্ঠানটির মালিক গাজী তৌকির রহমান শুভ বরিশাল বিএম কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক এবং আওয়ামী লীগের মহানগর কমিটির সদস্য। তার বিরুদ্ধেও চেক ডিজঅনারের মামলার তথ্য রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটিই পুলিশের জন্য বুট, ট্রেনিং ও প্যারেড বুট এবং ক্যানভাস জুতা সরবরাহে প্রায় ১০৫ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে।
এ ধরনের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজ প্রদানকে বিশেষজ্ঞরা অস্বচ্ছ, প্রশ্নবিদ্ধ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করছেন। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দাবি, সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রম যথাযথ নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের নতুন ইউনিফর্মের জন্য বিভিন্ন ধরনের কাপড় ইতোমধ্যে সরবরাহ করছে নোমান গ্রুপ। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা সবার আগে নতুন ইউনিফর্ম পেয়েছেন।
তেজগাঁও এলাকায় কর্তব্যরত এক ট্রাফিক পুলিশের সদস্য জানান, নতুন ইউনিফর্মের কাপড় আগের তুলনায় বেশি শক্ত ও ভারী মনে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় এই ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করা কষ্টসাধ্য হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, শীতকালে ইউনিফর্মটি পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হলেও গরমের সময়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডিউটি করা কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরে পুলিশের জন্য প্রায় ১২ লাখ মিটার কাপড় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ইতোমধ্যে ৩ থেকে ৪ লাখ মিটার কাপড় সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, পুলিশ সদস্যরা দীর্ঘ সময় রোদে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করেন বিবেচনায় নিয়ে জার্মান প্রযুক্তির বিশেষ ‘হারকোমা’ রং ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণ রঙের তুলনায় বেশি ব্যয়বহুল। পাশাপাশি ২৪০ জিএসএম মানের কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে বেশি আরামদায়ক।
এদিকে, ঘোষিত আয়ের বাইরে প্রায় ১৯ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। আদালত ইতোমধ্যে তার বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
দুদকের তথ্যমতে, তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৮ কোটি ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যা অসাধু উপায়ে অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করেছে দুদক। এছাড়া এসব অবৈধ সম্পদ অর্জনে অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০০৮-এর মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ বা মামলা চলমান থাকলে, তাকে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম থেকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়ার বিধান রয়েছে। এ কারণে দুদকের মামলা বা কালো তালিকাভুক্তির বিষয়টি সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত চলমান থাকা সত্ত্বেও নোমান গ্রুপকে পুলিশের জন্য কাপড় সরবরাহের বৃহৎ কাজ দেওয়া হয়েছে, যা ক্রয় নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
তবে এ বিষয়ে নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম জানান, “দুদকের মামলা রয়েছে ঠিকই, তবে সেটি এখনও তদন্তাধীন। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকায় সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।”
বাংলাদেশ পুলিশের জন্য বিভিন্ন ধরনের বুট, জুতা ও তোয়ালে সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছে ফ্রেন্ডস ট্রেডিং কর্পোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বুট, ট্রেনিং ও প্যারেড বুট, ক্যানভাস জুতা, নারী পুলিশ সদস্যদের পাম্প শু, অফিসারদের ক্যানভাস শু এবং তোয়ালে সরবরাহে প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ১০৫ কোটি ২৬ লাখ ৮৯ হাজার ৬২০ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী গাজী তৌকির রহমানের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট ৫৫ লাখ টাকার চেক প্রতারণা সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক পলি আফরোজ এ আদেশ দেন।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আহাদ আলী খান জানান, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ২০১৮ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি থেকে একই বছরের ২০শে জুলাইয়ের মধ্যে কাজী আতিকুর রহমানের কাছ থেকে গাজী তৌকির তার ব্যাংক হিসাবে ৫৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। পরে টাকা ফেরত চাইলে তিনি টালবাহানা শুরু করেন এবং ২০১৯ সালের ১৩ই অক্টোবর মার্কেন্টাইল ব্যাংক সাভারের হেমায়েতপুর শাখার একটি হিসাবে “মেসার্স সুরাইয়া কনস্ট্রাকশন” নামের বিপরীতে ৫৫ লাখ টাকার একটি চেক ইস্যু করেন। তবে ১৪ই অক্টোবর চেকটি জমা দেওয়া হলে তা ডিজঅনার হয়।
চেক ডিজঅনার মামলা, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং জুতা উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বিষয়ে বক্তব্য নিতে একাধিকবার ফোন করেও গাজী তৌকির রহমানের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত মামলাগুলো সাধারণত পর্যাপ্ত নথিপত্র ও প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতেই দায়ের হয়ে থাকে, যা সাধারণ ফৌজদারি মামলার তুলনায় অধিক প্রমাণনির্ভর। এ ধরনের মামলায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাজা হওয়ার সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। ফলে এমন ব্যক্তি বা তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা সমীচীন নয় বলে মত দেন তারা।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তাধীন ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে কোনো সরকারি সংস্থা জেনেশুনে কার্যাদেশ দিলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কার্যত দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার শামিল। এতে সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। আবার যদি না জেনেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও ক্রয় প্রক্রিয়ার দুর্বলতা কিংবা যোগসাজশের আশঙ্কা থেকে যায়। উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যাদেশ স্থগিত রাখা উচিত।”
প্রসঙ্গত, নোমান গ্রুপ থেকে মেট্রোপলিটন ও বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের জন্য ৭ লাখ মিটার ‘আয়রন টিসি প্লেইন’ কাপড় সংগ্রহে ব্যয় হয়েছে ৩০ কোটি ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ টাকা। একই খাতে ১ লাখ ৭৫ হাজার মিটার ‘টিসি টুইল কমব্যাট’ কাপড় কিনতে খরচ হয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ টাকা। জেলা পুলিশের জন্য ১০ লাখ ২০ হাজার মিটার ‘কফি টিসি টুইল’ কাপড় ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা।
এছাড়া, মেট্রোপলিটন ও বিশেষায়িত পুলিশ সদস্যদের জন্য ৫ লাখ মিটার ‘কফি টিসি টুইল’ ফ্যাব্রিক কেনা হয়েছে ১৯ কোটি ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকায়। একই সঙ্গে ডাবল পিলো কভারসহ ১ লাখ ৫০ হাজার পিস বেডশিট কেনা হয়েছে, যার ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫০ টাকা।
প্রশিক্ষণরত পুলিশ সদস্যদের জন্য ৬০ হাজার মিটার সাদা শার্টের কাপড় কিনতে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার ৯৪০ টাকা। এ ছাড়া পিলো কভারসহ ১ লাখ পিস সিঙ্গেল বেডশিট কেনা হয়েছে ১১ কোটি ৯৭ লাখ ৯৯ হাজার ৯০০ টাকায়।
অন্যদিকে, ফ্রেন্ডস ট্রেডিং কর্পোরেশন থেকে ৪০ হাজার জোড়া প্রশিক্ষণ ও প্যারেড বুট ক্রয় করা হয়েছে ৯ কোটি ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২ লাখ পিস তোয়ালে কেনার জন্য ব্যয় হয়েছে ৮ কোটি ৯৪ লাখ ২০০ টাকা। ২ লাখ জোড়া বুট কেনা হয়েছে, যার মোট মূল্য ৪৯ কোটি ৯৪ লাখ ২০০ টাকা।
এছাড়াও ১ লাখ ৮০ হাজার জোড়া ক্যানভাস জুতা সংগ্রহে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি ৫৮ লাখ ৬০ হাজার ২০০ টাকা। নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য ১৭ হাজার জোড়া পাম্প শু কিনতে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪৯ হাজার ২০ টাকা।
ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, যথাযথ বিধি-বিধান ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সব ধরনের কেনাকাটা সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অস্বচ্ছতার সুযোগ নেই।
তবে পুলিশের ইউনিফর্ম ও জুতা কিনতে স্বচ্ছতা সংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য জানতে পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. বাহারুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। একইভাবে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন) মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
