কারাগারে হলমার্ক-তানভীরের মৃত্যু: আওয়ামী লীগ আমলে উন্মোচিত দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির ইতিহাস

কারাগারে হলমার্ক-তানভীরের মৃত্যু: আওয়ামী লীগ আমলে উন্মোচিত দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির ইতিহাস
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে পরিচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারির মূল চরিত্র হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তানভীর মাহমুদ (৫৫) শনিবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আটক হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে বন্দি ছিলেন।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিচালক মো. জান্নাতুল ফরহাদ গতকাল এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি তানভীর মাহমুদ শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢামেকে স্থানান্তর করা হয় এবং বিকেল চারটায় ৬০২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে এবং রাত সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি কিডনি সমস্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় দীর্ঘদিন ভুগছিলেন।

হলমার্ক কেলেঙ্কারির পটভূমি: ৪০০০ কোটি টাকার বিশাল লুটপাট

হলমার্ক দুর্নীতির ঘটনা বাংলাদেশের আর্থিক খাতে এক অন্ধকার অধ্যায়। ২০১২ সালের ৪ঠা অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজধানীর রমনা থানায় মামলা করে। অভিযোগ করা হয় হলমার্ক গ্রুপের মালিকানাধীন কাল্পনিক কোম্পানি ‘ম্যাক্স স্পিনিং মিলস’ এর নামে সোনালী ব্যাংক থেকে ৫২৬ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০.৫ কোটি টাকা সরাসরি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাত করা হয়। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পরিচয়পত্র, চুক্তিপত্রসহ নথিপত্র জাল করে ঋণ তোলা হয়, যা পরে ব্যবহার না করে লুট হয়।

সোনালী ব্যাংকের রূপোসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে ৪০০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ জাল নথিতে তোলা হয়, যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্ক্যাম হিসেবে চিহ্নিত। এতে ব্যাংক কর্মকর্তারা, হলমার্ক এর মালিকের পরিবারসহ অনেকেই জড়িত ছিলেন। দুদকের তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, তানভীর মাহমুদ এবং তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম পরিচালক হিসেবে এই ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দেন।

গ্রেপ্তার এবং বিচার: ১২ বছরের লড়াইয়ের পর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

কেলেঙ্কারি ঘটনা ফাঁসের পরপরই, ২০১২ সালের ৮ই অক্টোবর ঢাকার একটি বাড়ি থেকে পুলিশ তানভীর মাহমুদ এবং তার শ্যালকসহ গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ২০১৩ সালের ৭ই অক্টোবর দুদক ১১টি মামলায় ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দায়ের করে, যাতে ২৬০০ কোটি টাকার লুটের অভিযোগ ছিল।

তদন্তের সময় তানভীর নিজেই স্বীকারোক্তি দেন যে, তিনি ব্যাংকের বোর্ড অফ ডিরেক্টরদের ঘুষ দিতে ৩ কোটি টাকা তাসলিম হাসানকে দিয়েছিলেন।

২০১৬ সালে আদালত দুটি মামলায় তানভীরসহ ১৯ জনকে অভিযুক্ত করে। এরপর দীর্ঘ ১২ বছরের বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের ১৯শে মার্চ ঢাকার প্রথম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. ফারুক উদ্দিন তানভীর মাহমুদ, তার স্ত্রী জেসমিন ইসলামসহ ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

এছাড়া প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে অতিরিক্ত শাস্তি এবং জরিমানা ঘোষণা করা হয়। অন্যান্য সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন তানভীরের শ্যালক তুষার আহমেদ, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া এবং ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা। রমনা থানার এক মামলায়ও তিনি কারাবন্দি ছিলেন।

ব্যাংকিং খাতে এখনো অস্থিরতা

হলমার্ক কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে এবং জনগণের আস্থা ভেঙে দেয়। এতে সোনালী ব্যাংকের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াও দুজন ব্যাংক কর্মকর্তার ‘আত্মহত্যার’ ঘটনা ঘটে। তানভীরের মৃত্যুতে এই আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যান্য অভিযুক্তদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যদিও আইনব্যবস্থা এখনো চলমান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনা ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু এখনো অনেক ফাঁক রয়ে গেছে। দুই ব্যাংক কর্মকর্তার আত্মহত্যা এবং তানভীরের মৃত্যুতে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে।

তানভীর মাহমুদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাজী কালু মাহমুদের ছেলে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর লাশ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

Visited 17 times, 1 visit(s) today