নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সার কারখানায় গ্যাসের দাম ৮৩% বৃদ্ধি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা কৃষি খাতে নতুন ধাক্কা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পূর্বের ১৬ টাকা থেকে ২৯.২৫ টাকা প্রতি ঘনমিটারে উন্নীত এই দাম কার্যকর হবে ১ ডিসেম্বর থেকে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এতে সারের উৎপাদন খরচ বাড়বে, কৃষকদের উপর চাপ বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিইআরসি ২৩ নভেম্বর এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বলেছে, এটি পেট্রোবাংলা, টাইটাস গ্যাস, বখরাবাদ গ্যাসসহ বিভিন্ন গ্যাস কোম্পানির প্রস্তাবের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, এই হার নির্ধারণে সরকারের ৬ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি ভর্তুকি এবং এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ড থেকে অতিরিক্ত ১০৭৫ কোটি টাকার বরাদ্দ বিবেচনা করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিক) এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, এতে সারের দাম বাড়বে এবং কৃষকরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
বর্তমানে দেশে বার্ষিক ৩ থেকে ৩.২ মিলিয়ন টন ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে, কিন্তু গ্যাস অভাবে ১.৬ থেকে ২.১ মিলিয়ন টন আমদানি করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস সংকটে যমুনা সার কারখানা ৩৬১ দিন, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা ২৭৩ দিন এবং গোরেশাল সার কারখানা ১৯৮ দিন বন্ধ ছিল।
এখন গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা বর্তমানে প্রতি কেজি ৩৮ টাকা। বিসিক ডিলারদের কাছে ২৫ টাকায় সরবরাহ করে, যা কৃষকদের কাছে ২৭ টাকায় পৌঁছায়—সরকার প্রতি কেজি ১৩ টাকা সাবসিডি দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধিতে সারের দাম ২০-৩০% বাড়াতে পারে। বিডিডাইজেস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরিয়া ও ডিএপি-এর মতো সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গ্যাসের দাম বাড়লে সারের খরচ বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনশীলতা কমাতে পারে, যা খাদ্য আমদানি-নির্ভর দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে কৃষকরা উতপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে কৃষি পেশা ছেড়ে অন্যান্য খাতে যেতে বাধ্য হবেন, যা আমদানি-নির্ভরতা বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে তুলবে।
কৃষি উপদেষ্টা লে. জেন (অব.) এমএ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাম্প্রতিক সময়ে বলেছিলেন, “যতদিন আমি দায়িত্বে থাকব, সারের দাম বাড়ানো হবে না।”
তবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পর এই প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিল্প খাতে বিদেশি বিনিয়োগের পতনের ও একে একে তিন শতাধিক কারখানা বন্ধের পর এখন কৃষি খাতও সংকটের মুখে।
পেট্রোবাংলা গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি অনুসন্ধানী কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে, কিন্তু কৃষি বিশেষজ্ঞরা সরকারের কাছে সাবসিডি বৃদ্ধি ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
