গ্যাস সংকটে সার কারখানাগুলো বন্ধ দীর্ঘদিন, আরও নতুন ৩টি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের

গ্যাস সংকটে সার কারখানাগুলো বন্ধ দীর্ঘদিন, আরও নতুন ৩টি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের
শেয়ার করুন

মাসের পর মাস ধরে দেশের সার কারখানাগুলো বন্ধ পড়ে আছে গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে। এরমধ্যেই সরকার পরিকল্পনা নিচ্ছে নতুন ৩টি সার কারখানা স্থাপনের।

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


দেশে সার উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে তিনটি নতুন সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। প্রস্তাবিত কারখানাগুলোর মধ্যে ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনকারী, চট্টগ্রামে বছরে ৪ লাখ মেট্রিক টন টিএসপি উৎপাদনকারী এবং নরসিংদীর পলাশে বছরে ২৪ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশে সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো, কৃষি খাতে সার সরবরাহ জোরদার এবং শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিসিআইসি।

বিসিআইসির অধীনে বর্তমানে সাতটি সার কারখানা রয়েছে—এর মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া এবং দুটি নন-ইউরিয়া সার কারখানা।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। ওই বছরে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়, যা মোট চাহিদার ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

পড়ুন: ২০ মাস ধরে বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা, রাষ্ট্রীয় ক্ষতি আড়াই হাজার কোটি টাকা

পড়ুন: রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা বন্ধ, আমদানি ব্যয় সমন্বয়ে সারের দাম বৃদ্ধি: বিপর্যয়ে কৃষি, ব্যাহত শস্য উৎপাদন

পড়ুন: গ্যাস ও কাঁচামালের সংকটে চট্টগ্রামের তিন সার কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, আমন মৌসুমে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা

একই অর্থবছরে দেশে টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদা ছিল যথাক্রমে ৭ লাখ ৫০ হাজার ও ১৪ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বিসিআইসির কারখানাগুলোতে উৎপাদন হয়েছে যথাক্রমে ৬৮ হাজার ২৫৯ ও ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন। এই উৎপাদন টিএসপি ও ডিএপির মোট চাহিদার যথাক্রমে ৯ দশমিক ১০ ও ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ, চাহিদার বড় অংশই আমদানি করে মেটানো হচ্ছে।

বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়া সারে সরকার ২৩ হাজার টাকা, টিএসপিতে ৪৯ হাজার ১৭০ টাকা এবং ডিএপিতে ৯৮ হাজার ৮৪০ টাকা ভর্তুকি দেয়।

এসব বিবেচনায় সরকার নতুন তিনটি সার কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে চালু কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ও সেগুলো আধুনিক করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ভোলায় দৈনিক ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের পরিকল্পনা

দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা মেটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ভোলায় নতুন একটি ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কারখানাটিতে প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করা হবে।

পড়ুন: কাঁচামাল সংকটে বন্ধ দেশের একমাত্র ডিএপি সার কারখানা: দেশের কৃষি খাতের ভবিষ্যৎ কী?

পড়ুন: শেখ হাসিনা সরকারের স্থাপিত ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় প্রথম বছরেই মুনাফা ২৩৩ কোটি টাকা

পড়ুন: উৎপাদন বন্ধ হয়ে অচল দেশের সার কারখানাগুলো, আমদানি নির্ভরতায় বাংলাদেশ: জানালেন শিল্পমন্ত্রী

বিসিআইসির তথ্য বলছে, কারখানাটি চালু রাখার জন্য দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস লাগবে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কারখানাটি স্থাপিত হলে দেশের ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অংশ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, “দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভোলায় প্রস্তাবিত ইউরিয়া সার কারখানা নির্মাণের কাজ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ, কারিগরি প্রস্তুতি, অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।”

চট্টগ্রামে বছরে চার লাখ টন টিএসপি উৎপাদনের উদ্যোগ

ফসফেটজাত সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় নতুন টিএসপি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। টিএসপিসিএল কমপ্লেক্সের অব্যবহৃত জায়গায় প্রস্তাবিত কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা হবে ৪ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে বিসিআইসির টিএসপি কমপ্লেক্সে কাঁচামালের সংকট ও প্ল্যান্টের সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

পড়ুন: বন্ধ সার কারখানা, হুমকির মুখে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: মঙ্গার পদধ্বনি শোনা যায়

পড়ুন: চট্টগ্রামের দুটির পর এবার গ্যাস সংকটে ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানারও উৎপাদন বন্ধ

পড়ুন: তীব্র জ্বালানি সংকটে দুই বৃহৎ সার কারখানা সিইউএফএল ও কাফকোর উৎপাদন স্থগিত

নতুন কারখানা স্থাপন করা হলে টিএসপি সার উৎপাদনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ হবে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বাসসকে জানান, টিএসপি সারের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে টিএসপি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং সার সরবরাহে দেশীয় উৎপাদনের অবদান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

পলাশে ইউএফ-৮৫ কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা

নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসির অব্যবহৃত জায়গায় ইউরিয়া ফরমালডিহাইড-৮৫ (ইউএফ-৮৫) উৎপাদনের কারখানা করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা হবে ২৪ হাজার মেট্রিক টন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান শিল্প অবকাঠামো ও অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানো যাবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিল্পপণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

পড়ুন: সার কারখানায় গ্যাসের দাম বাড়লো: কৃষকের উপর বয়ে আসতে পারে নতুন চাপ

পড়ুন: গ্যাস সংকটে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ আশুগঞ্জ সার কারখানা

পড়ুন: তীব্র সার সংকটে ঝুঁকির মুখে কৃষি উৎপাদন: প্রয়োজনের এক-তৃতীয়াংশও নেই মজুদ

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা ব্যবহার করে নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। পলাশে প্রস্তাবিত ইউএফ-৮৫ কারখানার বিষয়ে উৎপাদন প্রযুক্তি, বাজারের চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা

নতুন তিনটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন চালু হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ শ্রমিক ও পরিচালনাকর্মীদের পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।

ভোলা, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় শিল্প অবকাঠামোর ব্যবহার বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বাসসকে বলেন, “নতুন কারখানা স্থাপনের ফলে নির্মাণ কাজ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে কতজনের কর্মসংস্থান হবে, তা প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা, উৎপাদন প্রযুক্তি ও জনবল কাঠামো নির্ধারণের পর বলা সম্ভব হবে। আমরা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প খাতে দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চাই।”

Visited 2 times, 2 visit(s) today