❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
সারের ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী, মেহেরপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে নতুন ডিলারদের তালিকায় বিএনপি নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়ের নাম রয়েছে। এ নিয়োগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে এখনো চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত এক গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজশাহীতে নতুন ৬৯ জন ডিলারের তালিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগের তালিকা তৈরি করা হলেও রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এসেছে।
রাজশাহীর নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৯ জনের মধ্যে একজন জামায়াতে ইসলামীর কর্মী। বাকিদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী অথবা তাদের স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের সদস্য রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে
। নিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা আর্থিক নথি পাওয়া যায়নি।
মেহেরপুরে নতুন ২২ জন ডিলার নিয়োগ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বিএনপি নেতাদের ছেলে, ভাই ও ভাতিজাসহ আত্মীয়স্বজন রয়েছেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ের কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানের ছেলে আদনান সাদী, ভগ্নিপতি আরক মিয়া এবং ভাগিনার স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
দলের কয়েকজন নেতা-কর্মীর অভিযোগ, ডিলার নিয়োগে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে এম এ হান্নান বলেছেন, তার ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট তিনটি ইউনিয়নে যোগ্য আবেদনকারী না থাকায় তারা নিয়োগ পেয়েছেন বলে তার দাবি। অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগকেও তিনি গুজব বলে উল্লেখ করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভার ১০৬টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৮২৫ জন আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর ২৯২ জনের নাম কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে সুপারিশ করা হয়। প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে তিনজনের নাম পাঠানোর প্রক্রিয়া ছিল।
তবে সুপারিশের তালিকায় নামের অবস্থান পরিবর্তন বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে।
নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন জানিয়েছেন, আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করে তালিকা জেলায় পাঠানো হয়েছিল। এরপর চূড়ান্ত তালিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা তার জানা নেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান বলেছেন, উপজেলা থেকে পাঠানো নামগুলো সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে। অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, তিনি নিজে এ ধরনের কোনো লেনদেন করেননি।
সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের অংশগ্রহণ নিয়েও নীতিমালা রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত সমন্বিত নীতিমালায় একই পরিবারে একাধিক ডিলার নিয়োগের সুযোগ বন্ধের বিধান রাখা হয়।
এ বিধান নিয়ে আদালতে আইনি প্রক্রিয়াও হয়েছে। ফলে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নীতিমালার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, যেহেতু বিএনপি সরকার ক্ষমতায়, দলটির বাড়তি সুবিধা পাবে এটাই স্বাভাবিক। এসব নেতাকর্মী গত ১৭ বছর বঞ্চিত থেকেছে, তাই তাদের বিষয়টি বিবেচনা করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে থেকে আমাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ করেছি। মাঠ প্রশাসন ও সেই অনুযায়ী কাজ করেছে।
