❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
তাঁর ভাষায়, সিদ্ধান্তটি “অপরিণত” এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।
শেখ হাসিনা প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতে তাঁর উপস্থিতি যদি তারেক রহমানের সফরের পথে বাধা হয়, তাহলে তাঁর বাবা—বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান—যখন দিল্লি সফর করেছিলেন, তখন তিনি সেখানে নির্বাসিত জীবন কাটালেও সেই সফর কীভাবে সম্ভব হয়েছিল?
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার, ১৩ই অক্টোবর, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিমসটেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দেননি।
একই শহরে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের দুই জ্যেষ্ঠ নেতার অনুপস্থিতি ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে ঢাকার কূটনৈতিক নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
১৪ই অক্টোবর প্রকাশিত পিটিআইকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানতে চান, “তাহলে দিল্লিতে আমার উপস্থিতি কীভাবে আজ জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমানকে ভারতে আসতে বাধা দিতে পারে? এই সিদ্ধান্তের আসল কারণ কী?”
১২ ও ১৩্ই সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ যোগ দেয়নি। ঢাকার যুক্তি ছিল, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
এদিকে শেখ হাসিনাকে ‘প্রত্যর্পণ’ করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মতে, শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। ভারতের সফর এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সেই সফরগুলোর পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি একইসাথে জানান, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার, কারাবাস, এমনকি মৃত্যুর মুখেও পড়তে হতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ‘বল প্রয়োগ’-এর নির্দেশ দেওয়ার কথিত অভিযোগে করা মামলায় এক ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের কথিত রায় দেওয়া হয়।
পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা প্রায় পাঁচ দশক আগের ঘটনা টেনে এনে নয়াদিল্লির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলো এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে তারেক রহমানের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা স্মরণ করেন, তারেক রহমানের বাবা ও বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে নয়াদিল্লি সফর করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনা তখন ভারতে বসবাস করছিলেন।
শেখ হাসিনা পিটিআইকে বলেন, “১৯৭৯ সালে তিনি যখন দিল্লি সফর করেন, আমি তখন দিল্লিতে থাকতাম। ১৯৮০ সালে তিনি যখন লন্ডনে যান, আমিও তখন লন্ডনে ছিলাম। ওই দুই শহরে আমার উপস্থিতি তাঁকে সেখানে যেতে বাধা দেয়নি।”
এই তুলনার মাধ্যমে শেখ হাসিনা বোঝাতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর উপস্থিতির কারণে তারেক রহমানের ভারত সফর এড়িয়ে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ নেই—বিশেষ করে তাঁর বাবা যখন শেখ হাসিনার উপস্থিতি সত্ত্বেও ওই শহরগুলোতে গিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশের অংশ না নেওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার মতে, এটি অপরিণত সিদ্ধান্ত ছিল এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে কাজে আসেনি।”
তাঁর যুক্তি, বড় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সম্মেলনে অংশ না নিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ হারিয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বার্তা দেওয়ার জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগকে ব্যবহার করারও সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তাঁর মতে, রাজনৈতিক হিসাবের বদলে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারতের আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনের আগে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে তারেক রহমানকে সম্মেলনের বিশেষ আলোচনাপর্বে আমন্ত্রণ জানান। বিমসটেক সাতটি দেশের একটি আঞ্চলিক জোট; পালাক্রমে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ।
১৪ই জুলাই তারেক রহমানকে পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে মোদি লিখেছিলেন, তাঁর অংশগ্রহণ “আলোচনাকে সমৃদ্ধ করবে”। তবে ঢাকা বাংলাদেশের নেতা হিসেবে আমন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক সংগঠনের সভাপতি হিসেবে আমন্ত্রণের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে।
১০ই সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির আমন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, “আমরা কীভাবে যাব? বাংলাদেশ সরকারের কাউকে কি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে? আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কে বলেছে যে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে? আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিমসটেকের সভাপতিকে।”
তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়া উচিত। “সময় অনুকূল হলে” সেই সফর হবে বলে জানান তিনি।
ভারতের বক্তব্য ছিল, তারেক রহমানকে ব্রিকসের বিশেষ আলোচনাপর্বে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশ অবশ্য ব্রিকস সম্মেলনে কোনো সরকারি প্রতিনিধিদল পাঠায়নি। আমন্ত্রণ নিয়ে এই বিরোধের সঙ্গে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থানও জড়িয়ে রয়েছে।
তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাননি—এর প্রায় এক মাস পর ভারত আয়োজিত আরেকটি বহুপক্ষীয় বৈঠকেও বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা অনুপস্থিত থাকেন।
১৩ই অক্টোবর নয়াদিল্লিতে বিমসটেকের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দেননি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। এর বদলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল পাঠায় ঢাকা।
বাংলাদেশের প্রথম আলো ১২ই অক্টোবর জানায়, ৪ঠা অক্টোবর কূটনৈতিক চিঠির মাধ্যমে বিমসটেক সচিবালয়কে সিদ্ধান্তটি জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশের চার সদস্যের প্রতিনিধিদলের তালিকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ছিল না।
প্রথম আলোকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানান, দুই দেশের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ১৯৯৭ সালে আঞ্চলিক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর এই প্রথম বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ দমন, সীমান্তপারের অপরাধ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, মানবপাচার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যান্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে বিক্ষোভের মুখে হাসিনা-সরকারের পতন এবং তাঁর দিল্লিতে অবস্থান নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর থেকে ঢাকা শেখ হাসিনাকে ‘প্রত্যর্পণের’ দাবি জানিয়ে আসছে।
শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি কার্যক্রমকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
গত ৫ই আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার পর বিরোধ আরও তীব্র হয়। পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই ঘটনার কারণে তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফরের পরিবেশ “বিষিয়ে গেছে”।
নয়াদিল্লি বলেছে, তারা ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেনি এবং বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে শেখ হাসিনার বক্তব্যকেও সমর্থন করেনি।
২৪শে সেপ্টেম্বর জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ুন কবির বলেন, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তারেক রহমানের সফরের আগে আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বানও জানান তিনি।
তবে পিটিআইকে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর নির্বাসন ঘিরে রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে জিম্মি করে রাখা সম্ভব নয়।
নয়াদিল্লিতে আয়োজিত বৈঠকে বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পরপর দুইবার অনুপস্থিত থাকার প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বড় বহুপক্ষীয় বৈঠকেও বাংলাদেশের নেতারা ভারতে যেতে অনাগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
এমন সময় শেখ হাসিনার এই বক্তব্য নতুন করে এই প্রশ্ন তুলেছে—ভারতকে দূরে ঠেলে দিলে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে, নাকি তাতে দেশেরই ক্ষতি হতে পারে?
