নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকারের অদুরদর্শীতা, আর্থিক খাতের লুটপাট, জামায়েত ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আধিপত্যের মাশুল গুণছে ব্যাংক খাত। খেলাপি ঋণ, নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেকটা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে এ খাতের মূলধন ঘাটতিও। চলতি বছরের জুন শেষে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে দেশের ২৪টি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের ঘাটতির অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। গত মার্চ শেষে ২৩ ব্যাংকের ঘাটতি ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। নতুন করে এনআরবিসি ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ঘাটতিতে পড়েছে। এ সময় বিদেশি খাতের হাবিব ব্যাংক ঘাটতি থেকে বেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তবর্তী সরকারের সময়কালে দেশের ব্যাংকিং খাতে অব্যাহত লুটপাট, অনিয়ম ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রতি নরম নীতির কারণে মূলধন ঘাটতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি উভয় খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক তাদের ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে, পুনঃতফসিল, স্থগিত সুদ এবং খেলাপি ঋণ লুকাতে নানা হিসাব কৌশল প্রয়োগ করা হলেও, প্রকৃত আর্থিক অবস্থার অবনতি ঠেকানো যায়নি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের আস্থার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক খাতে কার্যকর তদারকি ও দায়বদ্ধতার অভাবে এই সংকট আরও গভীর আকার নিচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষ পরিচালনা পর্ষদ এবং দুর্বল কর্পোরেট শাসনব্যবস্থার সুযোগে অনিয়মের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
অন্তবর্তী সরকারের সময়ে গৃহীত কিছু আর্থিক সিদ্ধান্ত ও শিথিল তদারকি নীতিই ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাত এখন শুধু মূলধন ঘাটতিতেই নয়, সামগ্রিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটেও ভুগছে—যা ভবিষ্যতে আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
জানতে চাইলে এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলী হোসেন প্রধানিয়া জানান, গত বছরের ডিসেম্বরেও এনআরবিসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। এখন তা সাড়ে ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এতে বড় অঙ্কের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। ফলে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকটি। প্রকৃত চিত্র বের করার পর উত্তরণের চেষ্টা করা হবে।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণের নামে বের করে নেয়া হচ্ছে। আগের আমলের কিছু ঋণ খেলাপি হলেও খেলাপি দেখানো হয়নি। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের অঙ্ক প্রতিনিয়িতই বাড়ছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের অঙ্ক প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এর বিপরীতে চাহিদামতো নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ফলে মূলধন হারিয়ে ফেলছে এসব ব্যাংক, যা দেশের পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংক খাতে মূলধন ঝুঁকিজনিত সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৪৭ শতাংশ-যা আন্তর্জাতিক কাঠামো অনুযায়ী ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকা উচিত। গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে সিআরএআর ছিল ৬.৭৪ শতাংশ।
সিআরএআর হচ্ছে একটি ব্যাংকের মূলধন ও তার ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত-যেখানে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সম্পদের হিসাব নির্ধারণ করা হয়।
জুন শেষে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, ১০টি বেসরকারি ব্যাংক, আটটি ইসলামি ধারার ব্যাংক এবং দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক ঘাটতিতে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে জনতা ব্যাংকের। জুন শেষে এই ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৭ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এরপর অগ্রণী ব্যাংকের ৭ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৭৩ কোটি এবং লুটপাটের শিকার বেসিক ব্যাংক ৩ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে।
জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, একসময় অনেক ভালো ছিল বেসিক ব্যাংক। মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। এখন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বেসিক ব্যাংককে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। কারণ ব্যাংকটির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এভাবে দীর্ঘদিন লোকসান আর ধুঁকে ধুঁকে চলার চেয়ে বন্ধ করে দেওয়াই ভালো। এখন নতুন করে জামায়েত নেতারা ব্যাংকটিকে কজ্বায় নেয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে বেসরকারি খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি ন্যাশনাল ব্যাংকের। জুন শেষে ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। এরপর এবি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। এছাড়া লুটপাটের শিকার পদ্মা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা।
এর বাইরে আইএফআইসি ব্যাংক ৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ১ হাজার ৮৭৮ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১ হাজার ৬৪০ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ১ হাজার ৩৮৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংক ৩১৬ কোটি, সিটিজেন ব্যাংক ৮৬ কোটি ও সীমান্ত ব্যাংক ৪৫ কোটি টাকা ঘাটতিতে পড়েছে।
শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি ইউনিয়ন ব্যাংকে। জুন শেষে এই ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের। এই ব্যাংকের ঘাটতি ১৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ১০ হাজার ৫০১ কোটি টাকা।
এছাড়া গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৫ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ৭৯ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ১ হাজার ৯৭৫ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ৯০১ কোটি এবং আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের ২৫৪ কোটি টাকা।
বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি কৃষি ব্যাংকের। শুধু বিশেষায়িত নয়, পুরো ব্যাংক খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতিও এই ব্যাংকের। তথ্যানুযায়ী জুন শেষে কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
